শেষ ট্রেনের অন্ধকার জানালা | ভয়ংকর রহস্যময় বাংলা গল্প
ভূমিকা
এই গল্পে আপনি পাবেন ভৌতিক অনুভূতি, মানসিক টানটান উত্তেজনা এবং এমন এক অভিজ্ঞতা যা গল্প শেষ হওয়ার পরেও মনে রয়ে যাবে অনেকক্ষণ।
রাতের শেষ ট্রেন ও ফাঁকা স্টেশনের আতঙ্ক
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। শীতের কুয়াশা পুরো স্টেশনটাকে এমন গ্রাস করে রেখেছে যে তিন ধাপ দূরেও মানুষ দেখা যায় না। আমি—সুদীপ—দীর্ঘ সফর শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, দিনের শেষ ট্রেনটা ছাড়া আর কোনও যানবাহন নেই। বন্ধুরা বলেছিলো—“কুলতলি স্টেশন থেকে শেষ ট্রেনে চড়িস না, ওটা নাকি ভালো না!”
(শেষ ট্রেনের অন্ধকার জানালা বাংলা গল্প)
আমি অবশ্য এসব কুসংস্কার মানি না। স্টেশন মাস্টারও নেই, শুধু একটা ম্লান লাল টিমটিমে লাইট। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দুইটা কুকুর ঘুমোচ্ছে।
কুয়াশায় ঢাকা নির্জন রেলস্টেশন
দূরের কুয়াশা ঠেলে ট্রেনটা ঢুকল। বারো বগির একটা লোকাল ট্রেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো—সব বগির আলো জ্বলে আছে, কিন্তু জানালা দিয়ে ভিতরে কাউকেই দেখা গেলো না। যেনো পুরো ট্রেনে একটিও মানুষ নেই।
নিঃসঙ্গ একটা ট্রেন মাঝরাতে আসবে—এমনটা কমই দেখা যায়।
আমি দ্বিতীয় বগিতে উঠলাম। ভেতরে নরম নরম হলুদ আলো, পরিষ্কার আসন, কোনো গন্ধ নেই। কিন্তু ঘর ঠাণ্ডা, অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। পুরো বগি যেন বরফে ঢাকা।
বগির শেষদিকে একটা মহিলা বসে আছেন মনে হল। সাদা শাড়ি, মাথা নিচু, হাত দুটো আলতোভাবে কোলে রাখা। আমি হালকা শান্তি পেলাম— কেউ তো আছে।(ট্রেন নিয়ে বাংলা রহস্য গল্প)
ট্রেন ছাড়তেই ভেতরে মৃদু গুঞ্জনের মতো শব্দ উঠল। প্রথমে মনে হল বাতাসের শব্দ, পরে বোঝা গেল—এটা মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো, অস্পষ্ট, যেন কেউ অনেকগুলো কথা একসঙ্গে বলছে।
ভৌতিক কথোপকথন ও অচেনা ইঙ্গিত
আমি মহিলার কাছে গিয়ে ভদ্রভাবে বললাম—
—“মাফ করবেন, এই বগিতে আর কেউ আছেন?”
মহিলা ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর মুখ অদ্ভুত ফ্যাকাসে, চোখের নিচে গভীর ছায়া। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—তিনি কিছুটা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিটা মানুষের মনে শান্তি দেয় না, বরং যেনো আরও ঠাণ্ডা করে।
তিনি ধীর গলায় উত্তর দিলেন—
আছে আরও অনেকে আছে আপনি দেখতে পাচ্ছেন না শুধু।
আমি হেসে বললাম—
—“মানে? আমি তো কেউ দেখি না।”
মহিলা আমার দিকে তাকালেন। আর তখনই লক্ষ্য করলাম—তার চোখ দুটোতে যেন আলো নেই।
গভীর কুয়াশার মতো শূন্যতা।
তিনি বললেন,
এ বগিতে কখনো একজনই থাকে না বাবু কেউ না কেউ ওঠেই।
আমি অস্বস্তি পেলাম। গলার ভেতর শুকনো ঠাণ্ডা ঢুকে গেল।
বললাম—
—“আপনি কোথায় যাবেন?”(গভীর রাতের ট্রেন ভৌতিক গল্প)
মহিলা এইবার জানালা বাইরের অন্ধকারে তাকালেন।ওপারে যেখানে আলো নেই তবু সবাই যেতে বাধ্য হয়।
অন্ধকার বগিতে রূপ বদলের রহস্য
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তে পুরো বগিটা কেঁপে উঠল। লাইট দু-তিনবার টিমটিম করে নিভে গেল আবার জ্বলে উঠল। মনে হলো ট্রেনের ছাদ থেকে কেউ ভারি কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে—ধাতব ঘর্ষণের ভয়ানক শব্দ।
আমি জানালার পাশের সিটে বসলাম। ট্রেনের বাইরে নিস্তব্ধ, অন্ধকার, কুয়াশামাখা জঙ্গল। ট্রেন যেন অতি ধীরে চলছে—স্বাভাবিক গতির অর্ধেক। (অন্ধকার জানালার ওপারের গল্প বাংলা)
হঠাৎ আমার পায়ের কাছে ঠাণ্ডা একটা বাতাস ছুঁয়ে গেলো। মনে হলো মাটিতে যেন কেউ হাঁটে। আমি নিচে তাকাতেই দেখলাম আসনের নিচে অস্বস্তিকর নড়াচড়া—কেউ যেন সারছে, ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
আমি চমকে উঠে পা পিছিয়ে নিলাম।
মহিলার দিকে তাকাতেই দেখি তিনি আগের সেই সাদা শাড়ি পরা মহিলা নেই।
তিনি নেই!
ওই একই সিটে এখন একজন বৃদ্ধ বসে আছেন—নির্মম দৃষ্টি, চোখ ফাঁকা, ঠোঁট নড়ছে না অথচ তার আশেপাশেই শোনা যাচ্ছে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর।
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালাম।
—“আপনি কে? ওই মহিলা কোথায় গেলেন?”
বৃদ্ধ একবারও আমার দিকে না তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
এ ট্রেনে সবাই আসে সবাই যায় কেউ নেই তবু সবাই আছে।
আমি বগি পরিবর্তন করতেই দেখলাম—দরজা বন্ধ। ট্রেনের দরজা জোরে টানলাম, কিন্তু খুললো না।
ট্রেন যেন আমাকে আটকে রেখেছে।
মনে হলো বাতাস ভারী হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আর ছাদের ওপর থেকে নখের মতো কিছু একটা ঘষে যাচ্ছে—ধীরে, খুব ধীরে।
আমি চিৎকার করতে গিয়ে দেখলাম—শব্দ বেরোচ্ছে না।
গলা যেন জমে গেছে।
হঠাৎ পাশের সিটে শব্দ—থাপ!
কেউ বসেছে।
আমি তাকাতেই দেখি—সাত-আট বছরের একটা মেয়ে। কপাল থেকে অর্ধেক চুল ঝুলে পড়েছে। তার পোশাক ছিঁড়ে গেছে, চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়।
সে কান পেতে বলল,
—“চুপ… বাবা আসছে…”
আমি তোতলাতে লাগলাম—
—“ক—কে তোমার বাবা?”
মেয়েটি একবার হাসল।
তার হাসিতে দাঁতের বদলে দেখা গেল—রক্ত-ভেজা গাঢ় কালো ফাঁকা।
তারপর সে জানালার দিকে আঙুল তুলল।
আমি জানালায় তাকালাম।
জানালার বাইরে কুয়াশার ভিতরে এক বিশাল লম্বা ছায়া ট্রেনের সমান্তরালে দৌড়াচ্ছে—কখনো কাছে আসছে, কখনো দূরে যাচ্ছে। তার হাতগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, আঙুলগুলো ছুঁতে পারে জানালা।
হঠাৎ সে জানালার কাঁচে ঠকঠক করে আঘাত করল। কাঁচ ফেটে গেল।
আমি পেছনে সরে এলাম। মেয়েটি বলল—
ও শুধু আলো খায়। তোমার দৃষ্টি যেদিকে সবচেয়ে ভয় পায়, সেখান থেকেই তোমাকে নিয়ে যাবে।
আমার মাথা কাজ করছিলো না। বগি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলাম। ঠিক তখনই আলো পুরো নিভে গেলো।
অন্ধকারে আমি কেবল শ্বাস নিতে পারছিলাম।
চারদিক থেকে কণ্ঠস্বর—
—“এসো… এসো… এসো…”
—“তোমার জায়গা প্রস্তুত…”
—“তুমিও যাত্রী…”
হঠাৎ ট্রেনের গতিবেগ অস্বাভাবিক বাড়তে লাগল।
অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়িয়ে হঠাৎ কোনো ঠাণ্ডা আঙুল আমার কব্জি চেপে ধরল—বরফের মতো ঠাণ্ডা।
আমি চমকে পেছিয়ে এলাম।
আলো আবার জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখি—বগিতে আমি ছাড়া কেউ নেই। না বৃদ্ধ, না মেয়ে, না মহিলা।
সবাই উধাও।
বগি পুরো ফাঁকা।
আমি দ্রুত অন্য বগিতে ঢুকলাম।
সেখানে আলো জ্বলছে, সিটে কয়েকজন সাধারণ যাত্রী বসে আছে—হাসছে, কথা বলছে।
তারা আমাকে দেখে বললো—
—“এদিকে আসুন ভাই, ওই বগিটা তিন বছরের মধ্যে খোলা হয় না। আপনি সেখানে উঠলেন কীভাবে?”
আমি স্তম্ভিত।
বললাম—
—“ওই বগিতে তো আলো জ্বলছিলো! একজন মহিলা ছিলো, এরপর একজন বৃদ্ধ… একটি মেয়েও—”
তারা সবাই থমকে গেলো।(ভয়ংকর বাংলা গল্প)
একজন বলল—
ও বগিতে ৩ বছর আগে আগুন লেগে ১২ জন মারা যায়। পুরো বগি কালো হয়ে গেছে। সেখানে আলোই জ্বলে না। আপনার চোখে ভুল দেখেছে।
আরেকজন বললো—
লোকজন বলে ওই বগিতে রাত বারোটার পর পুরনো যাত্রীরা ফের ওঠে। তারা কারও না কারও খোঁজে থাকে।
আমার গা ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি জানালা দিয়ে তাকালাম—দেখলাম সেই লম্বা ছায়াটা এখনও দৌড়াচ্ছে ট্রেনের পাশ দিয়ে। এবার আরও কাছে।
যেন বলছে—
তুমি ভুল বগিতে উঠে পড়েছিলে তাই তোমাকে ছাড়লাম কিন্তু পরের বার—আসন খালি থাকবে না
ট্রেন স্টেশন ঢুকতেই আমি দৌড়ে নেমে গেলাম।
এরপর আর কখনো রাতের শেষ ট্রেনে চড়িনি।
রাতে ঘুমোতে গেলেও কখনো কখনো অনুভব করি—জানালার বাইরে কেউ দৌড়াচ্ছে।
যেন ট্রেনের গতি থামলেও তার ছায়া থামে না।
আর মাঝে মাঝে ম্লান আলোতে দেখি—
সাদা শাড়ি পরা সেই মহিলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে।
হালকা হাসছে।
ধীরে বলছে—
“আরও অনেক যাত্রী অপেক্ষায় আছে… আসবে তো?”

0 Comments