ভেসে আসা সেই বাঁশির সুর
নির্জন পথে একলা যাত্রা
সন্ধ্যা প্রায় শেষ। হেমন্তের শেষ দিকে প্রকৃতিতে তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। কলকাতা থেকে অনেক দূরে, পুরুলিয়ার রুক্ষ লাল মাটির উপর দিয়ে চলে যাওয়া একটি সরু পিচ রাস্তা। এই পথে যাতায়াত কম, দু'পাশে শাল আর মহুয়ার ঘন জঙ্গল, যা সন্ধ্যার আবছা আলোয় আরও গাঢ় আর রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
অর্ণব একজন শখের ফটোগ্রাফার। তার উদ্দেশ্য ছিলো এই অঞ্চলের আদিবাসী জীবন ও প্রকৃতির ছবি তোলা। কাজ শেষে ফিরতে তার বেশ দেরি হয়ে গেছে। বাইকের হেডলাইটের দুর্বল আলোয় রাস্তাটা সাপের মতো এঁকে বেঁকে সামনে এগিয়ে চলেছে।(অচেনা এক মনোমুগ্ধকর সুর বাংলা গল্প)
হঠাৎই বাইকের চাকা একটি ছোট পাথরে ধাক্কা খেলো। অর্ণব সামলে নিল বটে, কিন্তু সেই ধাক্কায় বাইকটা অদ্ভুত শব্দ করে থেমে গেল। ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে না। ঘড়িতে তখন রাত দশটা ছুঁই ছুঁই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। অর্ণবের বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠলো। এ কী ঝামেলা!
হঠাৎ থেমে যাওয়া যাত্রা
বাইকটা টেনে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করল কী হয়েছে। ঘন অন্ধকারের মধ্যে তার টর্চের আলোয় কেবল যন্ত্রপাতির কিছু অংশ আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। এই শুনশান রাস্তায় সাহায্য পাওয়া অসম্ভব। অর্ণব বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো।(মনোমুগ্ধকর সুর নিয়ে রহস্যময় গল্প)
নৈঃশব্দ্য ভেদ করা বাঁশির সুর
প্রায় আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। চারপাশের নৈঃশব্দ্য যেন এক অদৃশ্য ভারী চাদরের মতো। হঠাৎ, সেই নৈঃশব্দ্য ভেদ করে ভেসে এল এক অপূর্ব বাঁশির সুর। সে সুর যেন এই পৃথিবীর নয়। করুণ, মিষ্টি, আবার কেমন যেন এক গভীর বেদনায় ভরা। যেন হাজার বছরের অপেক্ষা আর ভালোবাসার আর্তি মিশে আছে সেই সুরে।
অর্ণব চমকে উঠলো। এই গভীর জঙ্গলে এত রাতে কে বাঁশি বাজাচ্ছে? সে টর্চ নিয়ে শব্দের উৎস সন্ধানে এগোলো। শব্দের তীব্রতা বেড়ে আসছে ডান দিক থেকে, যেখানে জঙ্গল আরও ঘন।
ভয় আর কৌতূহল—দুইয়ের এক অদ্ভুত মিশ্রণে অর্ণবের পা যেন আপনা আপনি চলতে শুরু করল। সে জঙ্গলের ভেতরের দিকে একটি ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পেল। আলো লক্ষ্য করে আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে এক জায়গায় এসে দাঁড়ালো।(অচেনা এক মনোমুগ্ধকর সুর বাংলা গল্প)
ধ্বংসপ্রায় মন্দিরের সামনে
সেখানে ছিলো একটি ধ্বংসপ্রায় মন্দির, সম্ভবত বহু প্রাচীন। মন্দিরের চূড়া ভেঙে গেছে, দেওয়ালে লতা-গুল্মের আস্তরণ। আর সেই মন্দিরের চাতালে, একটি বিশাল মহুয়া গাছের নিচে, এক অপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হলো অর্ণব।
একটি মেয়ে সেখানে বসে আছে। তার পরনে সাদা শাড়ি, চুল খোলা, অন্ধকারেও তার রূপ যেন ঝলমল করছে। তার দু’হাতে রূপোর বালা, আর ঠোঁটে বাঁশি। বাঁশির সুর আসছে তার থেকেই।
চিত্রার আবির্ভাব
মেয়েটি বাঁশি বাজাচ্ছিল না, বাঁশিটা ঠোঁটের কাছে ধরা ছিল। সে এমন এক ভঙ্গিতে স্থির হয়ে বসেছিল, যেন সময়ের ফ্রেমে বাঁধা এক ছবি। তার দৃষ্টি ছিল চাঁদের দিকে, যা মেঘের আড়ালে ঢাকা।
অর্ণব নিঃশব্দে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে দেখছিলো। তার ভয় কেটে গিয়েছিল, এখন কেবল বিস্ময় আর মুগ্ধতা। মেয়েটি এত সুন্দর, তার বাঁশির সুর এত মায়াময়, যে এই নির্জন রাতের ভয়াবহতা যেন এক নিমেষে দূর হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর, মেয়েটি বাঁশিটা নামালো। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে অর্ণবের দিকে তাকালো। তার চোখে ছিলো এক গভীর বিষণ্ণতা। সেই দৃষ্টিতে কোনও রাগ বা বিরক্তি ছিলো না, ছিল কেবল এক নিদারুণ শূন্যতা।
মেয়েটি শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল, "কে আপনি? কেন এসেছেন এই পথে? এই পথে তো এখন কেউ আসে না।"
অর্ণব আমতা আমতা করে বলল, "আমি... আমি কলকাতা থেকে এসেছি। আমার বাইক খারাপ হয়ে গেছে। আমি ছবি তুলতে এসেছিলাম।"
মেয়েটি মৃদু হাসলো। তার হাসিতে ছিলো চাঁদের মতো আলোর স্নিগ্ধ কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। আপনি কি এই পথে হেঁটে যাওয়া সেই মানুষটির ছবি তুলছিলেন?"
অর্ণব বিভ্রান্ত হলো। "কোন মানুষ? আমি তো কেবল প্রকৃতির ছবি তুলছিলাম।"
মেয়েটি এবার উঠে দাঁড়ালো। সে ধীরে ধীরে অর্ণবের দিকে এগিয়ে এলো। যত কাছে আসছিল, তত অর্ণবের হৃদস্পন্দন বাড়ছিল। তবে তা ভয়ে নয়, বরং এক অবর্ণনীয় আবেগে। তার গা থেকে ভেসে আসছিল বুনো ফুলের এক মিষ্টি সুবাস।(গভীর অনুভূতির বাংলা গল্প)
এক অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প
আমার নাম চিত্রা মেয়েটি বললো। এই মন্দিরটা একসময় আমাদের গ্রামের কেন্দ্রোবিন্দু ছিলো। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই পথেই একদিন আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। বরের আসার কথা ছিলো রাতের প্রথম প্রহরে। সে আসছিল ঘোড়ার গাড়িতে, বাঁশি বাজাতে বাজাতে। সেই বাঁশির সুর শুনেই আমি অপেক্ষা করছিলাম এই মহুয়া গাছের নিচে।"
চিত্রার কণ্ঠস্বর ছিল কাঁচের মতো স্বচ্ছ। "কিন্তু সে আর পৌঁছায়নি। মাঝপথে ডাকাতরা হামলা করে। আমার বর, সেই সুরজিৎ, মারা যায়। তার ঘোড়ার গাড়ি আর বাঁশি এই মন্দিরেই পড়েছিল। আমি অপেক্ষা করেছিলাম, সারারাত... পরের দিন দুপুরে যখন জানতে পারলাম, তখন আমার সব আশা শেষ। এই গাছের নিচে, সেই শোকে আমিও নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলাম।"
অর্ণবের শরীর হিম হয়ে গেলো। সে যাকে দেখছে, সে একজন আত্মা, একজন ভূত। কিন্তু তার মধ্যে সেই পরিচিত ভূতুড়ে ভয়াবহতা নেই, আছে কেবল এক পবিত্র দুঃখ।
চিত্রা অর্ণবের কাঁধের কাছে হাত বাড়িয়ে দিলো। অর্ণব অনুভব করল না উষ্ণতা, কেবল এক শীতল, হালকা স্পর্শ।
"আমি আজও অপেক্ষা করি," চিত্রা ফিসফিস করে বললো। "যখনই কেউ এই পথে আসে, আমি ভাবি সে হয়তো সুরজিতের কোনো খবর নিয়ে এসেছে। আমি তাকে আমার বাঁশির সুরে কাছে ডাকি। কিন্তু কেউ আর আসে না। সবাই ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।"
অর্ণব সাহস করে জিজ্ঞেস করল, "আপনি... আপনি কেন এখনো এখানে?"
চিত্রা ম্লান হাসলো। "অপেক্ষা। যে ভালোবাসা জীবনের পথ পেরোতে পারল না, সেই ভালোবাসাই মৃত্যুর পর আমাকে এখানে বেঁধে রেখেছে। সুরজিৎকে আমি শেষবার দেখিনি। আমি শুধু তার বাঁশির সুর শুনেছিলাম।"
অর্ণব আর কোনও কথা বলতে পারলো না। সে কেবল অপলক তাকিয়ে রইল চিত্রার দিকে। এই প্রথমবার সে দেখল, ভূত মানেই ভয়ঙ্কর বা প্রতিশোধপরায়ণ নয়। ভূত মানে ভালোবাসার এক চিরন্তন, বেদনাবিধুর স্মৃতি।
চিত্রা বলল, "আপনার বাইক ঠিক হবে না। আপনার ফিরতে কষ্ট হবে। আপনি এক কাজ করুন..." সে হাত দিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিকে একটা পথ নির্দেশ করল। "এই পথে হেঁটে গেলে এক ঘণ্টা পর আপনি একটা ছোট গ্রাম পাবেন। সেখানে সাহায্য পাবেন।"
অর্ণব ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। সে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
চিত্রা আবার বাঁশিটা ঠোঁটে ধরল। এবার যে সুর বাজলো, তা আরও বেশি করুণ। যেন বিদায়ের সুর। অর্ণব যখন জঙ্গলের গভীরে পথ ধরে এগোচ্ছে, তখনও সেই সুর তার কানে আসছিল। সে বুঝলো, চিত্রা তাকে বিদায় জানাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে তার চিরন্তন অপেক্ষার সুর শোনাচ্ছে।
জঙ্গল পেরিয়ে যখন সে দূরের গ্রামটির আলো দেখতে পেল, তখন সে একবার পেছন ফিরে তাকালো। অন্ধকার আর মহুয়া গাছের আড়ালে সেই মন্দিরটি দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু সেই মধুর, বিষণ্ণ বাঁশির সুর তখনও ভেসে আসছিল।
অর্ণব জানত, সে যা দেখেছে, তা ভয় দেখানোর জন্য আসা কোনো প্রেতাত্মা নয়। সে দেখেছে এক অমর ভালোবাসা, যা এক নির্জন পথে আজও তার সুরজিতের জন্য অপেক্ষা করে চলেছে। সেই রাতের ঘটনা অর্ণবের মনে এক গভীর ছাপ রেখে গেল। ভয় নয়, বরং এক সুন্দর বিষণ্ণতার ছবি হয়ে রয়ে গেল চিত্রার সেই অপেক্ষার মুহূর্তটি।
উপসংহার“ভেসে আসা সেই বাঁশির সুর” কেবল একটি ভৌতিক বাংলা গল্প নয়। এটি ভালোবাসা, অপেক্ষা আর মানবিক আবেগের এক অনন্য দলিল। যেখানে ভূত মানেই ভয় নয়, কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে ভালোবাসার সবচেয়ে করুণ রূপ।

0 Comments