Advertisement

নিঃশব্দে শেষ হওয়া এক ভালোবাসার

 ভালোবাসার নীরব বিদায়




শুরুটা ছিলো খুব সাধারণ

ভালোবাসার গল্পগুলো সাধারণত খুব জাঁকজমক করে শুরু হয় না। আমাদেরটাও হয়নি।

একটা সাধারণ বিকেল, কলেজ লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে থাকা দুটো মানুষ—আমি আর সে। নামটা এখন আর উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করে না। নাম উচ্চারণ করলেই মনে হয়, বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো দরজা আবার খুলে যাচ্ছে।


সে তখন আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলো। খুব সাধারণ একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসিটাই আমার জীবনের অনেক বড় একটা অধ্যায়ের শুরু ছিলো।


আমরা কথা বলতাম বই নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে। তখন ভবিষ্যৎ মানে ছিলো—একসাথে থাকা।


ভালোবাসা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে ওঠে।


ভালোবাসা প্রথমে আগুনের মতো জ্বলে।

তারপর সেটা উনুনের আঁচ হয়ে যায়—চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবকিছু গরম রাখে।


আমাদের ভালোবাসাটাও ঠিক তেমনই ছিল।


প্রতিদিনের খেয়েছো?

রাতে ঘুমানোর আগে “শুভরাত্রি”

পরীক্ষার আগের টেনশন

আর ফলাফল ভালো হলে অকারণ উচ্ছ্বাস


সবকিছু মিলিয়ে আমরা একে অপরের জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিলাম।


সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটাই ছিলো এটা।


বিচ্ছেদ কখনো হঠাৎ হয় না

মানুষ ভাবে বিচ্ছেদ হঠাৎ হয়।

একদিন সকালে উঠে কেউ বলে, “আর ভালো লাগছে না।”


কিন্তু সত্যি বলতে বিচ্ছেদ হঠাৎ হয় না।

ওটা আসে ধীরে ধীরে, নীরবে।


আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিলো।


সে আগের মতো আর সব কথা বলতো না।

আমি জিজ্ঞেস করলে বলতো, “কিছু না, একটু ক্লান্ত।”


আমি বিশ্বাস করতাম।

কারণ ভালোবাসলে মানুষ বিশ্বাস করতেই চায়।


 নীরবতার শব্দ সবচেয়ে কষ্টের।

এক সময় বুঝতে পারলাম—আমাদের কথোপকথনের মাঝখানে নীরবতা ঢুকে পড়েছে।


আগে যেখানে দুই মিনিট চুপ থাকাও অস্বস্তিকর লাগতো,

এখন সেখানে আধাঘণ্টা চুপ থেকেও কেউ কিছু বলতো না।


সে ফোনে থাকতো, কিন্তু আমার সাথে না।

আমি পাশে থাকতাম, কিন্তু তার সাথে না।


এই দূরত্বটা কোনো ঝগড়া দিয়ে আসেনি।

এসেছিলো অবহেলা দিয়ে।


নিজেকে দোষী ভাবা

বিচ্ছেদের আগে মানুষ একটা অদ্ভুত পর্যায়ে যায়—

নিজেকে দোষী ভাবার পর্যায়ে।


আমি ভাবতাম,

আমি কি কম সময় দিচ্ছি?

আমি কি আর আগের মতো আকর্ষণীয় নই?

আমি কি বেশি আশা করছি?


নিজেকে ছোট করতে করতে আমি তাকে বড় করে তুলছিলাম।

এটাই ছিলো আমার সবচেয়ে বড় ভুল।


সেই দিনটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।


সে বলেছিলো,

“আমাদের একটু কথা বলা দরকার।”


এই বাক্যটার ভেতরেই বিচ্ছেদের গন্ধ থাকে।


আমরা বসেছিলাম পার্কের সেই বেঞ্চটাতে,

যেখানে একদিন সে আমার হাত ধরেছিলো।


আজ হাত ধরেনি।


সে বলেছিলো,

“আমি আর আগের মতো অনুভব করি না।”


আমি জিজ্ঞেস করিনি,

“কার জন্য?”


কারণ উত্তরটা আমি ভেতরে ভেতরে জানতাম।


 বিচ্ছেদের মুহূর্তে কেউ কাঁদে না।


মানুষ ভাবে বিচ্ছেদের সময় দুজনেই কাঁদে।


আসলে না।


একজন কাঁদে,

আরেকজন চুপ থাকে।


আমি কাঁদিনি।

কারণ তখনো বিশ্বাস করতে চাইছিলাম—এটা হয়তো সাময়িক।


সে উঠে চলে গিয়েছিলো।

পেছনে ফিরে তাকায়নি।


আমি তখনো বেঞ্চে বসে ছিলাম।


বিচ্ছেদের পর জীবন হঠাৎ থেমে যায় না।

সূর্য ওঠে, মানুষ কাজে যায়, শহর চলে।


শুধু একজন মানুষের ভেতরে সবকিছু থেমে যায়।


আমি সকালে উঠতাম, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকত না।

ফোনে মেসেজ চেক করতাম, কিন্তু নামটা আর আসত না।


সবচেয়ে কষ্টের ছিলো—

তার সাথে না কথা বলার অভ্যাস করা।


স্মৃতিগুলো সবচেয়ে নির্মম

সে চলে যাওয়ার পর বুঝলাম—

স্মৃতিরা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে।


একটা গান,

একটা রাস্তা,

একটা শব্দ


সবকিছুতেই সে।


ভালোবাসা চলে গেলেও স্মৃতিগুলো থেকে যায়।

আর সেগুলোই মানুষকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।



নিজেকে আবার খুঁজে পেতে 

অনেক সময় লেগেছিল।


ধীরে ধীরে আমি আবার নিজের দিকে ফিরলাম।


বই পড়লাম।

লিখলাম।

চুপচাপ নিজেকে বোঝার চেষ্টা করলাম।


আমি বুঝলাম—

ভালোবাসা হারানো মানে নিজের অস্তিত্ব হারানো নয়।


কাউকে ভালোবাসা জীবনের অংশ,

পুরো জীবন নয়।



শেষটা আসলে শেষ নয়

আজ অনেকদিন হয়ে গেছে।


সে হয়তো সুখে আছে।

আমি সত্যিই চাই সে ভালো থাকুক।


কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়,

তাহলে বিচ্ছেদের পরেও ঘৃণা থাকে না।


এই গল্পটা বিচ্ছেদের,

কিন্তু ভাঙচুরের নয়।


এই গল্পটা শেখায়—

নিজেকে হারিয়ে ভালোবাসা করা উচিত নয়।


মানুষ একা থাকতে শেখে না, শিখে যায়

বিচ্ছেদের পর মানুষ হঠাৎ একা হয়ে যায় না।

একাকীত্ব ধীরে ধীরে শেখায়—

কীভাবে নিজের সাথেই বসে থাকা যায়।


শুরুর দিকে আমি নিজেকেই সহ্য করতে পারতাম না।

ঘরের দেয়ালগুলো কেমন যেন কথা বলত।

রাতগুলো খুব লম্বা মনে হতো,

আর সকালগুলো অর্থহীন।


একদিন বুঝলাম—

আমি আসলে তাকে হারাইনি,

আমি হারিয়েছি সেই মানুষটাকে,

যে আমি ওর সাথে থাকলে হয়ে উঠতাম।


এই উপলব্ধিটা খুব ব্যথার ছিলো।

প্রশ্নগুলো উত্তর ছাড়াই থেকে যায়


বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে কষ্টের জিনিস হলো—

অজস্র প্রশ্ন, কিন্তু কোনো উত্তর নেই।


কেন সে বদলে গেল?

আমি কি যথেষ্ট ছিলাম না?

আরেকটু চেষ্টা করলে কি থাকা যেত?


এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।

কারণ ভালোবাসা কোনো অঙ্ক নয়,

যেখানে হিসাব মেলালেই ফল পাওয়া যায়।


এক সময় আমি প্রশ্ন করা বন্ধ করলাম।

কারণ সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি নয়—

কিছু প্রশ্ন মেনে নিতে হয়।



সামাজিক মাধ্যমের নীরব যুদ্ধ

সবচেয়ে কঠিন ছিল—

সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে দেখা।


একই মানুষ,

কিন্তু আমার ছাড়া।


হাসি, ছবি, নতুন মানুষ—

সবকিছু যেন আমাকে দেখানোর জন্যই।


আমি প্রথমে ব্লক করিনি।

নিজেকে শক্ত প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম।


কিন্তু শক্ত হওয়া মানে নিজেকে কষ্ট দেওয়া নয়।

একদিন সাহস করে ব্লক করলাম।


সেই দিনটা ছিলো 

নিজের জন্য প্রথম সঠিক সিদ্ধান্ত।


ভালোবাসার ভুল সংজ্ঞা

বিচ্ছেদের পর বুঝলাম—

আমি ভালোবাসাকে ভুল বুঝেছিলাম।


আমি ভেবেছিলাম,

ভালোবাসা মানে নিজেকে ভুলে যাওয়া।

ভালোবাসা মানে সব সময় ছাড় দেওয়া।

ভালোবাসা মানে কষ্ট সহ্য করা।


আসলে ভালোবাসা মানে—

নিজের মর্যাদা ধরে রাখা।

নিজেকে ছোট না করা।

আর যেখানে সম্মান নেই,

সেখানে থেমে যাওয়া।


এই শিক্ষা আমি পেয়েছি খুব দেরিতে,

কিন্তু একদম বিনা মূল্যে নয়।


কেউ আসে, কেউ যায়


একদিন হঠাৎ বুঝলাম—

আমার জীবনে আবার মানুষ আসছে।


কেউ বন্ধু হয়ে,

কেউ পরিচিত হয়ে,

কেউ সাময়িক হয়ে।


আমি আর কাউকে আঁকড়ে ধরিনি।

কারণ আমি শিখে গেছি—

সবাই থাকার জন্য আসে না।


কিছু মানুষ আসে শুধু শেখাতে,

কিছু মানুষ আসে নিজেকে চিনিয়ে দিতে।


সে হয়তো এসেছিল আমাকে ভাঙতে,

যাতে আমি নিজেকে নতুন করে গড়তে পারি।


অনেকদিন ধরে আমি ভেবেছিলাম—

আমি তাকে ক্ষমা করেছি।


কিন্তু আসলে করিনি।

আমি শুধু চুপ ছিলাম।


ক্ষমা করা মানে ভুলে যাওয়া নয়।

ক্ষমা করা মানে নিজের বুকের ভার হালকা করা।


একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম—

“আমি আর এই বোঝা বয়ে বেড়াব না।”


সেদিন সত্যিই হালকা লেগেছিলো।


মাঝে মাঝে ভাবি—

যদি আবার দেখা হয়?


হয়তো কোনো রাস্তার মোড়ে,

হয়তো কোনো বইয়ের দোকানে।


আমি কি তাকাবো?

হয়তো তাকাবো।


কিন্তু আর থামব না।


কারণ কিছু মানুষ স্মৃতিতে সুন্দর,

বাস্তবে নয়।



আজ আমি আগের মতো নই।


আমি এখন একা থাকতে ভয় পাই না।

আমি নিজের সাথে কথা বলতে পারি।

নিজের সিদ্ধান্তে দাঁড়াতে পারি।


ভালোবাসা যদি আবার আসে—

আমি তাকে স্বাগত জানাব।


কিন্তু নিজের শর্তে।


আমি আর কাউকে নিজের সবটা দিয়ে

নিজেকে শূন্য করবো না।


এই গল্পটা শুধুই আমার নয়।

এই গল্পটা তাদের সবার—

যারা ভালোবেসে ভেঙেছে,

কিন্তু ভেঙে পড়ে থাকেনি।


বিচ্ছেদ তোমাকে দুর্বল করে না।

বিচ্ছেদ তোমাকে সত্যিকারের মানুষ বানায়।


যদি তুমি এখনো কারো স্মৃতিতে আটকে থাকো—

বিশ্বাস করো,

একদিন তুমি নিজেই তোমাকে উদ্ধার করবে।


আর সেই দিনটা হবে

তোমার জীবনের সবচেয়ে শান্ত দিন।

Post a Comment

0 Comments