এক চঞ্চল মেয়ে
গ্রামের নাম ছিল শিমুলতলা। খুব বড় কোনো গ্রাম নয়, তবে মানুষে মানুষে সম্পর্ক ছিলো গভীর। সেই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলো একটি মেয়ে—নাম তার রাইসা। ছোটবেলা থেকেই সে ছিলো ভীষণ চঞ্চল। এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারত না। কখনো গাছে উঠছে, কখনো বা স্কুল থেকে ফিরে খাতা ছুঁড়ে ফেলে ছুটছে নদীর ধারে।
রাইসাকে নিয়ে গ্রামের মানুষের মন্তব্য ছিলো একটাই—
“মেয়েটা বেশি চঞ্চল, ভবিষ্যতে কিছু হবে না।”
চঞ্চলতা কি সত্যিই দোষ?
রাইসার মা প্রায়ই চিন্তায় পড়ে যেতেন। সমাজের কথা, আত্মীয়দের কথা, প্রতিবেশীদের কানাঘুষা—সব মিলিয়ে তিনি প্রায়ই মেয়েকে বকতেন।
“মেয়ে মানুষ হয়ে এত লাফালাফি ভালো না,”
“চুপচাপ থাক, না হলে মানুষ কী বলবে?”
কিন্তু রাইসা বুঝতে পারতো না—স্থির থাকা মানে কী। তার মাথার ভেতর সবসময় হাজারো প্রশ্ন, হাজারো কৌতূহল। আকাশ কেন নীল, নদী কেন বয়ে যায়, মানুষ কেন একরকম নয়—এই প্রশ্নগুলোই তাকে চঞ্চল করে রাখত।
### স্কুলজীবনের সংগ্রাম
স্কুলে রাইসার অবস্থা ছিলো আরও খারাপ। ক্লাসে সে চুপচাপ বসে থাকতে পারতো না। শিক্ষক যখন পড়াতেন, সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকত। কখনো খাতায় ছবি আঁকত, কখনো বেঞ্চের নিচে পা দোলাত।
ফলাফল?
শিক্ষকদের চোখে সে ছিলো “অমনোযোগী ছাত্রী”।
পরীক্ষার রেজাল্ট মাঝারি। মেধা ছিলো, কিন্তু নম্বর তার পক্ষে কথা বলতো না। সহপাঠীরা অনেকেই এগিয়ে যাচ্ছিলো, আর রাইসা পড়ে যাচ্ছিলো আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে।
এক শিক্ষক, এক মোড় ঘোরানো ঘটনা
সবকিছু বদলে যেতে শুরু করলো নবম শ্রেণিতে উঠে। নতুন একজন বাংলা শিক্ষক এলেন—নাম মাহফুজ স্যার। তিনি অন্য শিক্ষকদের মতো ছিলেন না। প্রথম দিনেই তিনি লক্ষ করলেন, রাইসা ক্লাসে বসে থাকলেও চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আগ্রহ।
একদিন ক্লাস শেষে তিনি রাইসাকে ডেকে বললেন,
“তুমি এত অস্থির কেন?”
রাইসা প্রথমে ভয় পেয়ে গেলো। ভেবেছিলো আবার বকা খাবে। কিন্তু সাহস করে বললো,
“স্যার, আমার মাথার ভেতর অনেক কিছু চলে। চুপ থাকতে পারি না।”
স্যার হেসে বললেন,
“এটা সমস্যা না। এটা শক্তি।”
এই একটি বাক্যই রাইসার জীবনে প্রথমবারের মতো চঞ্চলতাকে অপরাধ নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখালো।
লেখালেখির শুরু
মাহফুজ স্যার রাইসাকে একটি খাতা দিলেন। বললেন,
“যখন অস্থির লাগবে, তখন লেখো। যা মনে আসে।”
প্রথমে রাইসা বুঝতে পারেনি কী লিখবে। পরে সে লিখতে শুরু করলো—
নিজের ভাবনা, গ্রামের গল্প, নদীর কথা, নিজের রাগ, নিজের স্বপ্ন।
অদ্ভুতভাবে লেখার সময় সে শান্ত হয়ে যেত।
এক মাস পর স্যার তার লেখা পড়ে বললেন,
“তুমি গল্প বলতে পারো। খুব ভালো পারো।”
এই প্রশংসা রাইসার জীবনে প্রথম সত্যিকারের স্বীকৃতি।
সমাজের বাধা এখনো ছিলো
তবে সবকিছু সহজ ছিলো না। লেখালেখি করে কী হবে—এই প্রশ্নটা সবাই করতো।
মেয়ের লেখক হওয়ার স্বপ্ন শুনে অনেকেই হাসতো।
“এগুলো শখের ব্যাপার,”
“মেয়েদের এসব মানায় না,”
“ভবিষ্যৎ বানাতে হলে বাস্তব হও।”
রাইসা কাঁদতো, কিন্তু থামত না। চঞ্চলতা তাকে থামতে দিত না।
বড় শহরে পা রাখা
এইচএসসি পাস করার পর রাইসা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন জীবন। এখানে তার চঞ্চলতা নতুন রূপ নিলো। বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হলো।
প্রথমবার তার একটি লেখা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হলো। নিজের নাম দেখে তার চোখে পানি এসে গিয়েছিলো।
সে বুঝতে পারলো—
যাকে সবাই সমস্যা বলেছিলো, সেটাই তার পরিচয়।
একদিন রাইসা একটি লেখা লিখলো—গ্রামের একটি চঞ্চল মেয়েকে নিয়ে, যাকে কেউ বোঝেনি। লেখাটি ভাইরাল হয়ে গেলো। হাজার হাজার মানুষ কমেন্ট করলো।
অনেক মা লিখলো,
“আমার মেয়েটাও এমন।”
অনেক মেয়ে লিখলো,
“এই গল্পটা আমার জীবনের মতো।”
সেদিন রাইসা বুঝলো, তার চঞ্চলতা শুধু তার নিজের না—এটা অনেকের কণ্ঠস্বর।
আজ রাইসা একজন পরিচিত লেখক ও বক্তা। সে স্কুলে গিয়ে শিশুদের বলে—
“চঞ্চল হওয়া দোষ না। নিজেকে বোঝো।”
রাইসার জীবনে পরিচিতি আসার পরও তার ভেতরের চঞ্চলতা একটুও কমেনি। বরং এখন সেই চঞ্চলতা আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে। আগে সে প্রশ্ন করত নিজের জন্য, এখন প্রশ্ন করে সমাজের জন্য। মানুষের কষ্ট, অবহেলা, নীরব কান্না—সবকিছু তাকে অস্থির করে তুলত।
একদিন অনেক বছর পর রাইসা তার গ্রাম শিমুলতলায় ফিরে গেল। শহরের কোলাহল থেকে দূরে সেই চেনা মাটির গন্ধ তাকে আবার ছোটবেলার রাইসায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল। কিন্তু গ্রামটা আগের মতো নেই। কিছু পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, তবু মানুষের চিন্তাধারা অনেকটাই একই রয়ে গেছে।
সে দেখল—অনেক মেয়ে এখনো স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। কারণগুলোও একই:
“মেয়ে বড় হয়ে গেছে,”
“পড়ালেখা করে কী হবে,”
“বিয়ে দিলেই দায় শেষ।”
এই দৃশ্যগুলো রাইসার বুকের ভেতর ঝড় তুললো।
গ্রামের এক কোণে সে দেখলো একটি মেয়ে—নাম তার মিম। বয়স বড়জোর বারো কি তেরো। মিম ঠিক রাইসার ছোটবেলার মতোই। সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ, প্রশ্ন, কৌতূহল। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাকে নিয়ে একই কথা বলছে—
“এই মেয়েটাও বেশি চঞ্চল।”
“ভবিষ্যতে ঝামেলা করবে।”
রাইসা যেন নিজের অতীতকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।
সেদিন রাতে রাইসা ঘুমাতে পারল না। তার মনে পড়ল, যদি মাহফুজ স্যার না থাকতেন, তবে আজ সে কোথায় থাকত? সমাজের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আরেকটা নাম হয়ে যেতো।
পরদিন সে একটি সিদ্ধান্ত নিল—
সে গ্রামের জন্য কিছু করবে।
রাইসা শুরু করল ছোট পরিসরে। সপ্তাহে দুই দিন সে গ্রামের মেয়েদের নিয়ে বসতো। পড়ালেখা, গল্প, নিজের কথা বলা—সবকিছুর জায়গা ছিলো সেখানে। সে বলতো,
“তোমরা যেমন, তেমনই ঠিক আছো।”
প্রথমদিকে অনেক অভিভাবক সন্দেহ করেছিলো।
“এতে কী হবে?”
“মেয়েরা বেশি জানলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”
কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। মেয়েরা কথা বলতে শিখলো, প্রশ্ন করতে লিখলো, স্বপ্ন দেখতে লিখলো।
মিমের বদলে যাওয়া জীবন
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেলো মিমের মধ্যে। আগে যে মেয়েটিকে সবাই বকত, সে এখন খাতায় গল্প লেখে। স্কুলে সে প্রশ্ন করে, উত্তর খোঁজে। একদিন সে রাইসাকে বললো,
“আপু, আমিও আপনার মতো হতে চাই।”
এই কথাটা রাইসার চোখ ভিজিয়ে দিল।
তবে সব পরিবর্তন সবাই সহজে মেনে নেয়নি। গ্রামের কিছু মানুষ রাইসার বিরুদ্ধে কথা তুললো। বলা হলো—
“বাইরের শহুরে চিন্তা এনে গ্রাম নষ্ট করছে।”
“মেয়েদের মাথায় বেশি কিছু ঢোকাচ্ছে।”
রাইসার সামনে আবার সেই পুরোনো প্রশ্ন—থামবে, না চলবে?
চঞ্চল রাইসা থামার মানুষ নয়।
শক্ত করে দাঁড়ানো
সে সোজা গ্রামসভায় গিয়ে কথা বললো। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো—
“আমি কাউকে বিদ্রোহ শেখাচ্ছি না। আমি শুধু মেয়েদের মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখাচ্ছি।”
তার কথায় কেউ চিৎকার করলো না, কেউ হাততালি দিলো না। কিন্তু সবাই শুনেছিলো। আর সেটাই ছিলো সবচেয়ে বড় জয়।
গ্রাম থেকে ফিরে শহরে এসে রাইসা তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলো। সেই লেখা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়লো। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, সংগঠন তাকে ডাকা শুরু করল কথা বলার জন্য।
সে বুঝতে পারল—
তার গল্প আর শুধু তার নিজের নেই।
নিজের ভেতরের লড়াই
সবাই বাইরে থেকে তাকে শক্ত মনে করলেও, রাইসার নিজের ভেতরে লড়াই চলতো। ক্লান্তি আসতো, একাকীত্ব আসতো। মাঝে মাঝে সে নিজেকে প্রশ্ন করতো—
“আমি কি ঠিক পথেই আছি?”
তখন সে নিজের ছোটবেলার কথা মনে করত। সেই অবহেলিত, চঞ্চল মেয়েটির কথা। আর আবার দাঁড়িয়ে যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাইসার চঞ্চলতা নেতৃত্বে রূপ নিল। সে শিখল কখন কথা বলতে হয়, কখন শুনতে হয়। তার অস্থির মন এখন মানুষের কথা শোনার জন্য স্থির হতে জানে।
এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
শেষ নয়, শুরু
রাইসার গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ এমন গল্পের শেষ হয় না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আরেকটি চঞ্চল মেয়ে জন্ম নিচ্ছে—যাকে সমাজ বুঝতে পারছে না।
রাইসার কাজ শুধু একটি কাজ নয়—এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।
এক চঞ্চল মেয়ে মানে শুধু রাইসা নয়।
সে মিম, সে তোমার পরিচিত কেউ, সে হয়তো তুমিই।
যদি সমাজ তাকে থামাতে চায়,
তবু সে দৌড়াবে—
কারণ দৌড়ানোই তার স্বভাব,
আর স্বভাবই একদিন শক্তি হয়ে ওঠে।
তার জীবন প্রমাণ করেছে—
সমাজ যাকে সমস্যা ভাবে, সময় তাকে শক্তিতে বদলে দিতে পারে।
এই ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
১. প্রতিটি মানুষ আলাদা
২. চঞ্চলতা মানে অযোগ্যতা নয়
৩. সঠিক দিকনির্দেশনা জীবন বদলে দিতে পারে
৪. সমাজের কথা নয়, নিজের ক্ষমতা বিশ্বাস করা জরুরি।
.png)
0 Comments