নীরব সেই আত্মার ডাক
রাত্রির কুয়াশায় নিশুতি হিমশীতল পাহাড়ি জনপদ । চারদিক ঘিরে পাইন আর দেবদারুর ঘন বন। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে নেমে আসে সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা—কেউ বলে ঈশ্বরের নিঃশ্বা, কেউ বলে অন্য দুনিয়ার পর্দা। সেই জনপদেই প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে অদ্ভুত এক কাহিনি ঘুরে বেড়ায়। এক অচেনা মেয়েকে নিয়ে, যার পদচিহ্ন মাটিতে পড়ে না, যার ছায়া দেখা যায় না…
অরিন্দম নামের এক তরুণ সাংবাদিক। শহুরে ব্যস্ততার ক্লান্তি কাটাতে ও এক নতুন ফিচার স্টোরির খোঁজে সে চলে আসে দেওরিয়ার পাহাড়ি বাংলোতে। বাংলোটি আকারে ছোট হলেও পাথরের দেয়ালে শ্যাওলা জমে গিয়েছিলো। একদম নিভৃত, কেবল দূরে প্রবাহিত নদীর শব্দ আর অরণ্যের পাতার মর্মর।
ঠিক যেদিন সে বাংলোতে পৌঁছাল, সেই রাতে অদ্ভুত শীত ছিল। কুয়াশা এত ঘন যে দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। বাংলোর ম্যানেজার, এক বয়স্ক লোক—মধুসূদন—তাকে ঘরে রেখে বললো,
রাত বেশি হলে বাইরে বেরোবেন না। এখানে বাতাসেও পুরনো গল্পে কথা ফিসফিস করে।
অরিন্দম হেসেই উড়িয়ে দিলো। শহুরে মানুষ হিসেবে ভূত–টুত বিশ্বাস তার নেই। কিন্তু পরদিন থেকে অদ্ভুত ঘটনাগুলো শুরু হলো।
মধ্যরাত। অরিন্দম ঘুম থেকে চমকে উঠল। যেন কোনো মেয়ের অস্পষ্ট গলা—
“শুনতে পাচ্ছো?”
সে উঠে বসে চারপাশ দেখে। বাংলোর জানালার কাছে কুয়াশার সাদা পর্দা দুলছে। হাওয়ার শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অস্পষ্ট ফিসফিসানিটি আরও একবার ভেসে এলো।
“বাঁচাও…”
অরিন্দম ছুটে দরজার দিকে গেলে। দরজা খুলতেই ঠান্ডা কুয়াশার ঢেউ তার মুখে আছড়ে পড়লো। বাইরে কেউ নেই। কেবল নির্জন অরণ্য আর ক্রমশ পাতলা হয়ে যাওয়া চাঁদের আলো
সে স্বাভাবিক ভাবেই নিজের কল্পনা বলে ধরে নিয়ে ফিরে এল, কিন্তু তার অদ্ভুত মনে হলো—দরজার সামনে ভেজা মাটিতে যেন একজোড়া ছোট পায়ের ছাপ যা কয়েক কদম পরেই মিলিয়ে গেছে।
রদিন সকালে অরিন্দম গ্রামের চায়ের দোকানে গিয়ে মানুষের সঙ্গে গল্প জুড়লো। কিন্তু ‘কুহু’ নামটা শুনলেই সবাই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছু বলার আগে যেন গলা শুকিয়ে আসে সবার।
মধুসূদন তাকে আলাদা ডেকে নিয়ে বললো,
কুহুর কথা এখন আর কেউ তোলে না। অদ্ভুত মেয়ে ছিল বটে কিন্তু তার মৃত্যুর পর গ্রামের মনে ভিতরে ভয় ঢুকে গেয়েছে।
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছিল তার?”
মধুসূদন থেমে বললো,
“সে মারা গেছে। কিন্তু তার আত্মা বোধহয় এই কুয়াশায় আটকা পড়ে আছে। বিশেষ করে পূর্ণিমার রাত এলে—যেমন কাল আসছে—কেউ বাইরে বেরোয় না।”
অরিন্দমের আগ্রহ বাড়ল। সে সত্যিটা জানতে চাইল, কিন্তু গ্রামবাসীরা মুখ শক্ত করে রইল। শুধু একজন বৃদ্ধা আড়াল থেকে বললো,
মেয়েটাকে ভুল বুঝেছিলো সবাই। ও আত্ম এখনো সঠিক বিচার খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সেই রাতেই ঘটনাটা আরও তীব্র রূপ নিল। অরিন্দম কাজ করছিল। হঠাৎ, তার সামনে রাখা লণ্ঠনটা নিভে গেলো ঘর অন্ধকার। জানালা কাঁপতে শুরু করল নিজের থেকেই।
কেউ যেন জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। পরক্ষণেই, কুয়াশার মধ্যে একটি মেয়ের ম্লান অবয়ব দেখা গেলো—সাদা পোশাক, লম্বা চুল, কিন্তু মুখটা অস্পষ্ট। পরক্ষণেই সে হারিয়ে গেলো।
অরিন্দমের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়লেও, সে এবার সিদ্ধান্ত নিল—কুহুর রহস্য সে উদঘাটন করেই ছাড়বে।
বাংলোর স্টোররুমে খুঁজতে খুঁজতে অরিন্দম একটি পুরনো লোহার ট্রাঙ্ক পেলো। তার ভেতরে কয়েকটি পুরনো চিঠি, একটি ভাঙা চুড়ি এবং কুহুর একটি সেপিয়া রঙের ছবি। ছবিটিতে হাসছে এক কিশোরী মেয়ে—চোখে যেনো অনন্ত শান্তি।
কিন্তু প্রথম চিঠিটিই সব পাল্টে দিলো।
যদি কোনোদিন কেউ সত্য জানতে চায় তাকে বলো—আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি যা দেখেছিলাম তা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওরা সবাই আমাকে থামিয়ে দিয়েছিলো।
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলো। কুহু নিজের মৃত্যু আগে কিছু গোপন কথা জানত, যেটা গ্রামবাসীরা চায়নি কেউ জানুক।
চিঠিগুলোর একটিতে লেখা ছিলো,
“জঙ্গলের ধারের পুরনো কূপটাই আমার সর্বনাশের কারণ। সেদিন পূর্ণিমায় আমি সেখানে যা দেখেছিলাম—ওটা মানুষের চোখে দেখা উচিত ছিলো না।”
অরিন্দম বুঝল, রহস্যের কেন্দ্র সেই পুরনো কূপ।
পূর্ণিমার রাত অরিন্দম সেই রাতে বেরিয়ে পড়লো। কুয়াশা আগের দিনের তুলনায় আরও ঘন। চারদিকের শব্দগুলোই যেনো বদলে গেছে—পাতার শব্দ যেন দীর্ঘশ্বাসের মতো।
কূপটা জঙ্গলের গভীরে। ভাঙা পাথরের দেয়ালে শ্যাওলা। কূপের মুখে পুরনো প্রার্থনার ঘণ্টা বাঁধা—হাওয়ায় হালকা শব্দ তুলছে।
হঠাৎ সে টের পেল—তার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে ধীরে ঘুরতেই সে দেখতে পেলো সাদা পোশাকের সেই মেয়েটি। এবার স্পষ্ট। মুখটা অসাধারণ সুন্দর, কিন্তু গভীর দুঃখে ভরা।
“তুমি… কুহু?”
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
তুমি আমার কথা শুনতে পারছো কারণ তুমি আমাকে ভয় পাওনি।
অরিন্দম সাহস সঞ্চয় করে বললো, “তোমার সত্যি গল্পটা জানতে চাই।”
কুহু ধীরে ধীরে বলল—
“সেই রাত… আমি এখানে এসেছিলাম জল আনতে। তখন দেখেছিলাম গ্রামের মন্দিরের পুরোহিত আর কয়েকজন মিলে এক নিষ্ঠুর কাজ করছিল। ওরা এক গরিব অসহায় মেয়েকে বলি দিতে চাইছিলো ভূতের ভয় দেখিয়ে। আমি দেখেছিলাম। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। তাই…”
তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে কূপে মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো। পরদিন সবাই বললো—আমি নাকি ভুল করে পড়ে গেছি।
অরিন্দমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।
“তুমি আমাকে কি করতে বলছো?”
“সত্যিটা লিখে দিও। আমার নামটাকে কলঙ্কমুক্ত করো। মানুষ যেন জানে আমি কাউকে ভয় দেখাই না… কেবল আমার ন্যায় চাই।”
হঠাৎ জঙ্গলে যেন ঝড় উঠল। কুহুর অবয়বটা আরও অস্পষ্ট হয়ে গেলো।
সময় কম পূর্ণিমার আলো ফুরোলেই আমি আবার ও অদৃশ্য হয়ে যাবো।
অরিন্দম মধুসূদনকে নিয়ে গ্রামে গেলো। সে চিঠিগুলো দেখাল, কূপের পাশের ছবির কথা বললো। কয়েকজন বয়স্ক মানুষ প্রথমে অস্বীকার করলেও একসময় সব ফাঁস হলো—গ্রামের পুরনো পুরোহিত সত্যিই অবৈধ রীতির নামে বহু খারাপ কাজ করতো। কুহু সেটা দেখে ফেলেছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
গ্রামবাসীরা ভয়ে ও লজ্জায় সত্য লুকিয়ে রেখেছিলো।
সেই রাতেই গ্রামের মানুষ মিলে কুহুর স্মরণে কূপের পাশে একটি পাথরের ফলক বসাল—
কুহু সত্যের সাক্ষী।
বরফ ঝরা এক সকালে অরিন্দম বাংলো ছাড়ার আগে মুহূর্তে হঠাৎ সে অনুভব করলো—কেউ তাকে দেখছে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই কুয়াশার মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কুহুর ম্লান অবয়ব দেখা গেলো।
মেয়েটির মুখে এবার শান্তির হাসি।
“ধন্যবাদ…”
পরক্ষণে কুয়াশা তাকে গিলে ফেললো।
অরিন্দম বুঝে গেল—তার কাজ শেষ। কুহু অবশেষে মুক্তি পেলো।

0 Comments