রূপালি ডানার পরী
চন্দ্রবনের শেষ প্রান্তে একটি অদ্ভুত সীমারেখা ছিল।
একদিকে মানুষের জগৎ—মাটি, ঘাম, রক্ত আর সংগ্রামের পৃথিবী।
অন্যদিকে পরীদের রাজ্য—আলো, সুর, ডানা আর জাদুর আবেশ।
এই সীমান্ত কেউ অতিক্রম করতো না।
মানুষ ভয় পেত, আর পরীরা শিখেছিলো—
মানুষের প্রেম মানে ধ্বংস।
এই সীমান্তের কাছেই থাকত এক তরুণ—নাম তার অরুণ।
অরুণ ছিলো গ্রামছাড়া।
সে না পুরোপুরি শহরের, না পুরোপুরি গ্রামের।
সে বনকে ভালোবাসতো, কারণ বন প্রশ্ন করতো না।
প্রতিদিন ভোরে সে বাঁশি বাজাতো।
বাঁশির সুর বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে এমন জায়গায় পৌঁছাতো,
যেখানে মানুষের পা পড়ে না।
আর সেখানেই প্রথমবার তার সুর শুনেছিলো সে।
তার নাম ইলারা নামে এক পরী।
ইলারা ছিল পরীদের রাজ্যের রূপার ডানার পরী।
তার ডানায় সূর্যের আলো পড়লে মনে হতো,
কেউ আকাশ ভেঙে রূপা ঝরাচ্ছে।
পরীদের নিয়ম ছিল—
মানুষের সুর শোনা নিষেধ।
মানুষের দিকে তাকানো নিষেধ।
মানুষকে ভালোবাসা তো অকল্পনীয় অপরাধ।
কিন্তু অরুণের বাঁশির সুরে ছিলো কিছু আলাদা।
সে সুরে ছিল একাকীত্ব।
ছিলো প্রশ্ন।
ছিলো এমন এক ব্যথা।
ইলারা প্রতিদিন লুকিয়ে সীমান্তে আসতো।
ডানাগুলো গাছের আড়ালে লুকিয়ে
সে শুনতো সেই বাঁশির সুর।
সে জানতো না—
এই শোনা একদিন তার সবকিছু বদলে দেবে।
একদিন অরুণ বাঁশি বাজাতে বাজাতে থেমে গেলো।
সে অনুভব করছিলো—
কেউ তাকে দেখছে।
ভয় নয়, বরং অদ্ভুত শান্তি।
সে ধীরে মাথা তুললো।
আর তখনই—
বাতাস কেঁপে উঠলো।
পাতারা নড়ে উঠলো।
রোদ্দুর রূপা হয়ে ঝরে পড়লো।
গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ইলারা।
তার চোখে আকাশের নীল,
চুলে চাঁদের আলো,
আর ডানায়—স্বপ্ন।
দুজনেই স্তব্ধ।
মানুষ আর পরী—
দুই নিষিদ্ধ জগত মুখোমুখি।
অরুণ প্রথম কথা বললো না।
সে জানতো না কী বলতে হয়।
ইলারা ফিসফিস করে বললো,
“তুমি… সুর বানাও কেনো?”
অরুণ উত্তর দিলো,
“কারণ কেউ শোনে না।”
সেদিন তারা প্রেমে পড়েনি।
প্রেম হঠাৎ হয় না—
প্রেম ধীরে ধীরে জন্মায়।
প্রতিদিন তারা দেখা করতো।
অরুণ কথা বলতো মানুষের পৃথিবীর গল্প।
ইলারা বলতো পরীদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন।
ইলারা জানলো—
মানুষ কাঁদে, কিন্তু হাল ছাড়ে না।
ভালোবাসে, কিন্তু শর্তে।
অরুণ জানলো—
পরীরা হাসে, কিন্তু ভয় পায়।
তাদের জাদু আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নেই।
তাদের মাঝে কোনো স্পর্শ ছিলো না।
শুধু শব্দ, চোখ, আর নিঃশ্বাস।
কিন্তু নিষিদ্ধ সম্পর্ক সবচেয়ে দ্রুত গভীর হয়।
একদিন ঝড় এলো।
মানুষের জগতে ঝড় মানে—
ভাঙন।
পরীদের জগতে ঝড় মানে—
শাস্তি।
ইলারা ঝড়ের মধ্যে আটকা পড়লো সীমান্তে।
তার ডানা ভিজে ভারী হয়ে গেলো।
অরুণ তাকে আশ্রয় দিল তার ছোট কুঁড়েঘরে।
সেই প্রথম—
মানুষ আর পরী একই ছাদের নিচে।
কেউ কিছু বললো না।
শুধু ঝড়ের শব্দ আর হৃদয়ের ধাক্কা।
ইলারা ফিসফিস করে বললো,
“যদি কেউ জানে…”
অরুণ বললো,
“আমি তো থাকবো।”
এই “থাকবো” শব্দটাই ছিলো প্রেমের জন্ম।
পরীদের রাজ্যে কিছুই লুকানো থাকে না।
ইলারার ডানা ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো।
রূপা আর আগের মতো ঝলমল করছিলো না।
রাজ্যের প্রবীণরা বুঝে গেলো।
ইলারাকে ডাকা হলো আদালতে।
রায় ছিল কঠিন—
মানুষকে ভুলে যাও
না হলে ডানা হারাবে।
ডানা হারানো মানে—
পরী নয়, নির্বাসিত ছায়া।
ইলারা কাঁদেনি।
সে শুধু বলেছিলো,
ভালোবাসা কি অপরাধ?
উত্তর ছিল নীরবতা।
ইলারা সব সত্য অরুণকে বললো।
অরুণ হাসলো—
কিন্তু সে হাসি ভাঙা ছিলো।
সে জানতো,
মানুষ কখনো পরীর সমান হতে পারে না।
সে বললো,
“তুমি চলে যাও।
আমি একা থাকতে জানি।”
ইলারা বললো,
“আমি জানি না।”
সেই রাতে অরুণ সীমান্ত ছাড়িয়ে গেলো।
সে পরীদের রাজ্যে পা রাখলো—
যেখানে মানুষের যাওয়া নিষিদ্ধ।
তার শরীর জ্বলছিলো।
মাটি তাকে ছেড়ে দিচ্ছিলো না।
কিন্তু সে থামেনি।
পরীদের রানি অবাক হয়ে তাকালো।
একজন মানুষ,
ভালোবাসার জন্য মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে।
অরুণ বললো,
“আমি ডানা চাই না।
আমি জাদু চাই না।
আমি শুধু ওকে হারাতে চাই না।”
পরীদের রাজ্যে নিয়ম ভাঙা মানে বিপর্যয়।
কিন্তু ভালোবাসা ছিলো আরও শক্তিশালী।
রানি বললেন,
“একজনকে বেছে নিতে হবে—
পরী না মানুষ।”
ইলারা সামনে এলো।
সে নিজের ডানার দিকে তাকালো।
তারপর অরুণের দিকে।
রূপার ডানা ঝরে পড়লো।
ইলারা মানুষ হয়ে গেল।
ডানা নেই।
জাদু নেই।
কিন্তু তার চোখে ভয়ও নেই।
অরুণ কাঁদছিলো।
ইলারা বললো,
“আমি উড়তে পারতাম।
কিন্তু তোমার সাথে হাঁটতে চাই।”
তারা মানুষের জগতে ফিরে এলো।
কেউ জানতো না—
একসময় এক পরী এখানে ছিলো।
কিন্তু অরুণের বাঁশির সুর বদলে গেলো।
সে সুরে এখন শুধু একাকীত্ব নয়—
আশাও ছিল।
চন্দ্রবনের সীমান্ত আজও আছে।
মানুষ আর পরীর জগত আজও আলাদা।
কিন্তু রাতে যদি মন দিয়ে শোনো,
একটি বাঁশির সুর শোনা যায়।
সেই সুর বলে—
ভালোবাসা কোনো জগত মানে না।
ডানা থাক বা না থাক—
ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় জাদু।
ইলারা মানুষ হওয়ার প্রথম সকালটা ছিল ভয়ংকর নীরব।
কোনো ডানা নেই।
ঘুম ভাঙার সময় আর বাতাসের ভরসে ভেসে ওঠা যায় না।
পা দুটো মাটিতে আটকে থাকে—
ভারী, অনভ্যস্ত, অচেনা।
সে কুঁড়েঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো।
সূর্য উঠছে, কিন্তু সেই আলো আর শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় না।
আগে আলো ছিল অনুভূতি,
এখন শুধু দৃশ্য।
ইলারা ফিসফিস করে বললো,
“এটাই কি মানুষ হওয়া?”
অরুণ পাশে এসে দাঁড়ালো।
সে জানত না কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়।
সে শুধু বললো,
“মানুষ হওয়া মানে ধীরে শেখা।”
ইলারা হেসেছিলো।
সে হাসিতে ব্যথা ছিলো,
কিন্তু অনুশোচনা ছিলো না।
পরের দিনই গ্রামে কানাঘুষা শুরু হলো।
— “অরুণ কারে নিয়ে এসেছে?”
— “মেয়েটার চোখ অদ্ভুত।”
— “শহরের মেয়ে হবে?”
ইলারা বুঝতে পারছিলো—
মানুষের সমাজে জাদু নেই,
কিন্তু বিচার আছে।
সে কাপড় পরতে শিখছিলো।
আগে শরীর ছিল বাতাসের মতো,
এখন শরীর ঢাকতে হয়।
কিছু রাতে সে কেঁদে ফেলতো।
ডানা হারানোর জন্য নয়,
বরং পরিচয় হারানোর জন্য।
অরুণ বাঁশি বাজাত না সেই ক’দিন।
সে বুঝেছিলো—
সব সুর এখন সুখের নয়।
ইলারা একদিন বললো,
“আমি উড়তে পারতাম, জানো?”
অরুণ চুপ করে থাকলো।
ইলারা বলতেই থাকলো—
“আমি মেঘের ভেতর দিয়ে গিয়েছি।
বৃষ্টি আমার গায়ে লাগলে ব্যথা করতো না।
আমি তারাদের নাম জানতাম।”
অরুণ ধীরে বললো,
“আর এখন?”
ইলারা হাসলো।
“এখন আমি আগুনে হাত পুড়িয়ে ফেলি।”
এই হাসিই ছিলো সবচেয়ে কষ্টের।
এদিকে পরীদের রাজ্য শান্ত ছিলো না।
একজন রূপার ডানার পরী মানুষ হয়ে গেছে—
এ ঘটনা রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম।
আকাশের রং বদলাচ্ছিলো।
জাদু দুর্বল হচ্ছিলো।
পরীদের প্রবীণরা বললো,
“ভালোবাসা নিয়ম ভাঙলে,
জগৎ ভেঙে পড়ে।”
রানি নীরব ছিলেন।
কারণ তিনিও জানতেন—
নিয়ম বাঁচায় না,
কখনো কখনো ভালোবাসাই বাঁচায়।
একদিন ইলারা অসুস্থ হয়ে পড়লো।
পরীদের শরীর রোগ জানে না।
মানুষের শরীর জানে।
জ্বর, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট।
ইলারা ভয় পেয়ে বললো,
“আমি কি… মরে যাচ্ছি?”
অরুণ প্রথমবার ভেঙে পড়লো।
সে জানতো—
ভালোবাসার জন্য সে যে মূল্য দিয়েছে,
তা ইলারার শরীর দিচ্ছে।
গ্রামের ওঝা এলো।
সে চোখ কুঁচকে বললো,
“মেয়েটার শরীর… আলাদা।”
অরুণ শুধু বললো,
“ও মানুষ।”
কিন্তু সত্যটা এত সহজ ছিল না।
জ্বরের ঘোরে ইলারা স্বপ্ন দেখলো।
সে আবার উড়ছে।
ডানা ফিরে এসেছে।
কিন্তু নিচে তাকিয়ে সে দেখলো—
অরুণ একা দাঁড়িয়ে আছে।
সে বুঝে গেলো।
ডানা মানে দূরত্ব।
সে নিজেই ডানাগুলো খুলে ফেললো স্বপ্নে।
ঘুম ভাঙার পর জ্বর কমে গেলো।
সে ফিসফিস করে বললো,
“আমি ঠিক আছি।”
গ্রামের মোড়ল অরুণকে ডেকে পাঠালো।
“এই মেয়েটাকে বিয়ে করবি তো কর,
না হলে গ্রাম ছাড়।”
মানুষের সমাজে ভালোবাসা ব্যক্তিগত নয়,
সমষ্টিগত অনুমতির বিষয়।
অরুণ রাতে ইলারাকে বললো।
ইলারা অবাক হলো।
পরীদের রাজ্যে প্রেম মানে চুক্তি নয়।
সে জিজ্ঞেস করলো,
“বিয়ে মানে কী?”
অরুণ বললো,
“একসাথে থাকার অনুমতি।”
ইলারা হাসলো।
“ভালোবাসারও অনুমতি লাগে?”
সেই রাতে বন কেঁপে উঠলো।
আলো নেমে এলো।
একজন পরী এল—
ছোট ডানা, গম্ভীর চোখ।
সে ইলারাকে বললো,
“ফিরে এসো।
তোমার জাদু ফিরবে।”
ইলারা চুপ করে থাকলো।
দূত বললো,
“মানুষের শরীর তোমাকে শেষ করে দেবে।”
অরুণ সামনে এসে দাঁড়ালো।
দূত বললো,
“ভালোবাসা দিয়ে মৃত্যু ঠেকানো যায় না।”
ইলারা বললো,
“কিন্তু মৃত্যু দিয়ে ভালোবাসা ঠেকানো যায় না।”
পরীদের প্রস্তাব ছিল ভয়ংকর—
ইলারা যদি ফিরে যায়,
অরুণ তার স্মৃতি হারাবে।
ভালোবাসা থাকবে না,
কিন্তু জীবন থাকবে।
অরুণ রাজি ছিলো।
সে বলল,
“ও বাঁচুক।
আমি না থাকলেও।”
ইলারা কাঁদলো।
সে প্রথমবার বুঝলো—
মানুষের ভালোবাসা কেন ভয়ংকর।
কারণ মানুষ নিজেকে দেয়।
ইলারা সিদ্ধান্ত নিলো।
সে পরীদের রাজ্যে ফিরে গেলো—
কিন্তু শর্তে।
তার ডানা ফিরল না।
সে পরীও না, মানুষও না।
দুই জগতের মাঝখানে এক অস্তিত্ব।
পরীদের জাদু রইল,
মানুষের অনুভূতিও।
সে অরুণের স্মৃতি রাখলো।
অরুণও ইলারার।
কিন্তু তারা একসাথে থাকতে পারলো না।
চন্দ্রবনের সীমান্তে আজও বাতাস থেমে যায়।
কেউ কেউ বলে—
সন্ধ্যায় এক নারী দাঁড়িয়ে থাকে,
চোখে আকাশ, পায়ে মাটি।
আর দূরে,
একজন মানুষ বাঁশি বাজায়।
তারা কাছে আসে না।
কিন্তু তাদের সুর এক হয়।
সব প্রেম মিলনের জন্য নয়।
কিছু প্রেম শুধু পৃথিবীকে বদলানোর জন্য।

0 Comments