Advertisement

সাধারণ সময় অস্বাভাবিক সম্পর্ক

 অচেনা পরিচিতি






ভালোবাসার শুরু সবসময়ই খুব সাধারণ হয়।

আমাদেরটাও তাই ছিলো।


একটা কলেজ বাসস্টপ, বিকেলের আলো, আর অপেক্ষার ক্লান্তিতে বসে থাকা দু’জন মানুষ। কেউ কাউকে চেনা না, শুধু কাকতালীয়ভাবে প্রতিদিন একই জায়গায় দাঁড়ানো। প্রথমে চোখাচোখি, তারপর হালকা হাসি। সেই হাসির মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত স্বস্তি—যেন অচেনা কেউ খুব পরিচিত।

আমি তখন জীবনের সবচেয়ে সাধারণ সময় পার করছিলাম। পড়াশোনা, বাড়ি, কিছু স্বপ্ন—সবই ঠিকঠাক চলছিলো। কিন্তু ঠিকঠাক চলা জীবনে হঠাৎ করেই কেউ এসে দাঁড়ালে, সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়।


ওর নাম ছিল তিথি।


নামটার মতোই ও ছিলো শান্ত, নরম, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা দৃঢ়তা ছিল। প্রথম কথা হয়েছিলো খুব সাধারণভাবে—


“আজ বাস দেরি করছে, তাই না?”


সেই একটা বাক্য থেকেই শুরু। এরপর ধীরে ধীরে প্রতিদিন কথা। প্রথমে বাসস্টপে, পরে ফোনে। কথা বাড়তে থাকল, পরিচয় গভীর হতে থাকলো।


আমরা কেউ কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দিইনি। প্রেমটা আস্তে আস্তে ঢুকে পড়েছিলো কথার ফাঁকে, হাসির মধ্যে, অপেক্ষার সময়ে।



ভালোবাসার দিনগুলো কখন যে এত সুন্দর হয়ে ওঠে, সেটা টের পাওয়া যায় না তখন।


তিথি ছোট ছোট জিনিসে খুশি হতো। আমি যদি হঠাৎ ওর প্রিয় গানটা পাঠিয়ে দিতাম, সে বলতো,

“আজকের দিনটা ভালো হয়ে গেলো।”


আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় কথা বলতাম না। শুধু বলতাম—

“একসাথে থাকলে কেমন হবে?”


সেই “একসাথে” শব্দটার মধ্যে ছিল সব স্বপ্ন, সব নিশ্চয়তা।


কিন্তু বাস্তবতা কখনোই শুধু ভালোবাসা দিয়ে চলে না।



ধীরে ধীরে আমাদের পার্থক্যগুলো চোখে পড়তে শুরু করলো।


আমি ছিলাম একটু বাস্তববাদী। ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসেব করতাম। ক্যারিয়ার, দায়িত্ব, পরিবারের কথা ভাবতাম। আর তিথি ছিলো স্বপ্নময়। ও বিশ্বাস করত—সব ঠিক হয়ে যাবে, শুধু ভালোবাসা থাকলেই।


এই পার্থক্য শুরুতে মিষ্টি লাগলেও, পরে তা ভারী হয়ে উঠলো।


আমি যখন বলতাম,

“এভাবে চললে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে,”

তিথি বলতো,

“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?”


ভালোবাসার মধ্যে প্রশ্ন ঢুকলে, উত্তর দিলেও সন্দেহ থেকে যায়।



আমাদের ঝগড়াগুলো কখনো জোরে হতো না।

হতো নীরবে।


একটা মেসেজের দেরি, ফোন না ধরা, আগের মতো কথা না বলা—এই সব ছোট ছোট বিষয় জমতে জমতে বড় দেয়াল তৈরি করলো।


আমি ভাবতাম, ও বুঝবে।

ও ভাবত, আমি বদলে যাচ্ছি।


আসলে আমরা দু’জনেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম, কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করতে চাইনি।



একদিন তিথি বলল,

“আমাদের মধ্যে কি আগের মতো কিছু আছে?”


আমি চুপ করে ছিলাম।


কিছু প্রশ্নের উত্তর নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।


সেদিন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা থাকলেও আমরা হয়তো একসাথে থাকার মতো মানুষ নই।


বিচ্ছেদ কখনো হঠাৎ হয় না।

ওটা অনেক দিনের জমে থাকা না বলা কথার ফল।


সেদিন আমরা মুখোমুখি বসেছিলাম। কারও চোখে রাগ ছিল না, ছিল শুধু ক্লান্তি।


তিথি বলেছিলো,

“আমি আর কষ্ট করতে পারছি না।”


আমি বলিনি, “আমিও না।”

শুধু মাথা নেড়েছিলাম।


ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও যখন একসাথে থাকা কষ্ট হয়ে যায়, তখন আলাদা হওয়াই সবচেয়ে কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।



বিচ্ছেদের পর পৃথিবী থেমে যায় না।


বাস আসে, কলেজ চলে, মানুষ হাসে।

শুধু নিজের ভেতরের একটা অংশ নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে।


আমি তিথির নামটা ফোনে দেখলেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠত। মেসেজ করতে পারতাম না, আবার না করেও থাকতে পারতাম না।


কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না, শুধু যোগাযোগটা শেষ হয়।



এই বিচ্ছেদ আমাকে শিখিয়েছে

ভালোবাসা মানেই একসাথে থাকা নয়।

সব সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য তৈরি হয় না।

আর বিচ্ছেদ মানেই ব্যর্থতা নয়।


কিছু মানুষ আসে, আমাদের বদলে দিতে।

থেকে যায় স্মৃতি হয়ে।



সময় সব ক্ষত সারায় না, কিন্তু ব্যথার ধার কমিয়ে দেয়।


একদিন হঠাৎ তিথির কথা মনে পড়ল, কিন্তু চোখ ভিজলো না। বুঝলাম—আমি এগিয়ে যাচ্ছি।


ভালোবাসা ছিলো, তাই বিচ্ছেদটা এত গভীর ছিলো।

কিন্তু সেই গভীরতাই আমাকে মানুষ হিসেবে বড় করেছে।



এই বিচ্ছেদের গল্প কোনো অভিযোগের নয়।

এটা দুইজন মানুষের গল্প, যারা চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু একসাথে থাকা শেখেনি।


ভালোবাসা সবসময় শেষ হওয়ার জন্য আসে না।

কিছু ভালোবাসা আসে—আমাদের শক্ত করতে।



বিচ্ছেদের পর শহরটাকে নতুন মনে হতে লাগল।

একই রাস্তা, একই দোকান, একই বাসস্টপ—সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু তিথি নেই।


যে চায়ের দোকানে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম, সেখানে এখনো মানুষ বসে। হাসে। কথা বলে। শুধু আমাদের হাসিটা আর শোনা যায় না।


আমি বুঝলাম—জায়গা কখনো কাউকে ধরে রাখে না, স্মৃতিই মানুষকে আটকে রাখে।


অনেকদিন সেই বাসস্টপে আর দাঁড়াইনি। কিন্তু একদিন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাম। কোনো অপেক্ষা ছিল না, শুধু একটা অভ্যাস।


অভ্যাসও যে ভালোবাসার মতো শক্ত হয়, সেটা তখন বুঝেছি।



বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বেশি যেটা আসে, সেটা রাগ নয়—অপরাধবোধ।


আমি বারবার ভাবতাম,

“আর একটু বুঝলে কি সব ঠিক হয়ে যেত?”

“আরেকটু সময় দিলে কি সম্পর্কটা বাঁচত?”


এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। তবু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।


তিথি হয়তো ভেবেছে, আমি চেষ্টা করিনি।

আমি ভেবেছি, ও বুঝতে চায়নি।


কিন্তু সত্যিটা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও।



একাকীত্ব প্রথমে ভয় লাগায়।

তারপর ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে যায়।


রাতে ফোনে আর কোনো নোটিফিকেশন আসে না।

কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছো তো?”


এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলোই যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হারানোর পর বোঝা যায়।


আমি নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করলাম।

নিজের সাথে কথা বলা শিখলাম।

যা আগে তিথিকে বলতাম, এখন নিজের ভেতরেই বলি।


একাকীত্ব আমাকে দুর্বল করেনি, বরং শক্ত করেছে।



অনেকদিন পর একদিন হঠাৎ তিথির খবর পেলাম।


ও ভালো আছে।

নতুন শহরে আছে।

নিজের মতো করে বাঁচছে।


খবরটা শুনে কষ্ট লাগেনি। বরং কোথাও একটা শান্তি এসেছে।


ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে আলাদা হয়েও একে অপরজনের ভালো চাওয়া যায়।


সেদিন বুঝলাম—আমি ওকে হারাইনি, শুধু ওকে নিজের জীবন থেকে ছেড়ে দিয়েছি।



কিছু কথা কখনো বলা হয় না।

বললেও দেরি হয়ে যায়।


আমাদেরও অনেক কথা অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

শেষবার দেখা করার সময় আমি অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলাম।


যে আমি চেষ্টা করেছি,

যে আমি ভয় পেয়েছিলাম,

যে আমি ওকে এখনো সম্মান করি।


কিন্তু কিছু কথা না বলাই ভালো।

সব ব্যাখ্যা সম্পর্ককে বাঁচায় না।



সময়ের সাথে জীবনে নতুন মানুষ আসে।

কেউ বন্ধু হয়ে, কেউ অচেনা হয়ে।


কিন্তু তিথি আমাকে যে শিক্ষা দিয়ে গেছে, সেটা কেউ মুছতে পারবে না।


আমি শিখেছি—


* সম্পর্ক মানে শুধু ভালোবাসা নয়, বোঝাপড়া

* নীরবতা সবসময় শান্তি নয়

* সময়মতো কথা বলা জরুরি


এই শিক্ষা ছাড়া হয়তো ভবিষ্যতের কোনো সম্পর্কই টিকতো না।



এক সময় ভাবতাম, ভালোবাসা মানেই একসাথে থাকা।


এখন বুঝি—

ভালোবাসা মানে সম্মান,

ভালোবাসা মানে স্বাধীনতা,

ভালোবাসা মানে প্রয়োজনে ছেড়ে দেওয়ার শক্তি।


তিথিকে ভালোবেসেছিলাম বলেই আজ ওর চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পেরেছি।



সব বিচ্ছেদ দুঃখের হয় না।

কিছু বিচ্ছেদ মানুষকে ভেঙে নয়, গড়ে তোলে।


এই বিচ্ছেদের গল্প আমার জীবনের শেষ অধ্যায় নয়।

এটা একটা অধ্যায়, যেটা আমাকে পরের অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুত করেছে।


আমি এখনো ভালোবাসায় বিশ্বাস করি।

কিন্তু অন্ধভাবে নয়।



যদি কখনো তিথি এই গল্প পড়ে, আমি চাই ও জানুক—


আমাদের গল্পটা ব্যর্থ ছিলো না।

আমরা শুধু শেষ পর্যন্ত একসাথে যেতে পারিনি।


কিছু গল্প শেষ হয়,

কিন্তু তাদের অর্থ থেকে যায়।

Post a Comment

0 Comments