বৃষ্টির দিনে নীল চিঠি – হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বাংলা গল্প
শহরটার নাম কেউ ঠিক মনে রাখে না। কেউ বলে নদীর শহর, কেউ বলে বৃষ্টির শহর। আর নীলার কাছে শহরটা শুধু একটাই কারণে আলাদা—এখানেই সে প্রথম শিখেছিল, ভালোবাসা কখনো হঠাৎ আসে না, ধীরে ধীরে জমে ওঠে, ঠিক বৃষ্টির পানির মতো।
নীলা প্রতিদিন সকাল আটটায় বাসে করে কলেজে যেতো। বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান ছিলো। দোকানটা খুব সাধারণ—কাঠের বেঞ্চ, টিনের চাল, আর দেয়ালে পুরনো সিনেমার পোস্টার। কিন্তু দোকানের ছেলেটা, আরিফ, দোকানটাকে অসাধারণ করে তুলেছিলো।
আরিফ খুব বেশি কথা বলতো না। চোখে ছিলো একরকম স্থিরতা, যেন সবকিছু গভীরভাবে দেখে, কিন্তু প্রকাশ করে কম। নীলা প্রথমে শুধু চা খেত, কখনো লেবু চা, কখনো দুধ চা। আরিফ চা বানাত, কাপ বাড়িয়ে দিত, আর হালকা করে বলতো, (নীল চিঠি বাংলা গল্প)
— গরম আছে, সাবধানে।
এই সাবধানের মধ্যেই যেনো একটা অদ্ভুত যত্ন ছিলো।
প্রথম কয়েক মাস শুধু এটুকুই। কোনো গল্প নয়, কোনো প্রশ্ন নয়। শুধু চোখাচোখি, আর প্রতিদিনের অভ্যাস।
একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামল। এমন বৃষ্টি, যেন আকাশ নিজের ভেতরের সব কথা ঢেলে দিচ্ছে। বাস দেরি করছিল। নীলা ভিজে একেবারে চায়ের দোকানে ঢুকে পড়লো।
— ভিজে গেছেন, আরিফ বললো।
— হ্যাঁ, নীলা হেসে বলল, বৃষ্টি আজ একটু বেশি কথা বলছে।
আরিফ প্রথমবার হেসেছিলো সেদিন। খুব ছোট হাসি, কিন্তু নীলার মনে হলো, এই হাসিটা সে অনেকদিন ধরে দেখার অপেক্ষায় ছিলো।
সেদিন আরিফ বিনা পয়সায় চা দিলো। নীলা আপত্তি করেছিলো, কিন্তু আরিফ বলেছিলো,
— আজ বৃষ্টির দিনে ফ্রি।
সেই দিন থেকেই কথাবার্তা শুরু।
আরিফ জানাল, সে আগে পড়াশোনা করতো। বাবার হঠাৎ অসুস্থতায় সব ছেড়ে দোকান সামলাতে হয়েছে। নীলা বলল, সে বাংলা সাহিত্য পড়ে, লেখালেখি করতে ভালোবাসে। কথাগুলো খুব সাধারণ ছিলো, কিন্তু দুজনের মাঝখানে এক ধরনের নীরব বন্ধন তৈরি হচ্ছিল। (বাংলা রোমান্টিক গল্প)
এরপর একদিন নীলা লক্ষ্য করল, চায়ের কাপে নিচে ছোট একটা নীল কাগজ ভাঁজ করা। খুলে দেখল—
আজ আকাশ নীল না, তবু তোমার কথা মনে পড়ছে।
নীলার বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল। সে কিছু বললো না। শুধু চা শেষ করে কাগজটা ব্যাগে রেখে দিলো।
এরপর থেকে নীল কাগজের চিঠি নিয়মিত হতে লাগল। কখনো দুই লাইন, কখনো চার লাইন
নীলা কোনোদিন উত্তর দিত না। কিন্তু প্রতিদিন অপেক্ষা করত—আজ কী লেখা থাকবে?
একদিন সে নিজেই একটা চিঠি লিখলো। খুব ভয় ভয় করে কাপের নিচে রেখে দিলো।
সব কথা বলার জন্য শব্দ লাগে না।
আরিফ সেই চিঠি পড়ে সেদিন কিছু বলেনি। শুধু চায়ের সঙ্গে একটা অতিরিক্ত বিস্কুট দিয়েছিল।
এইভাবেই মাস পেরোতে লাগলো। শহরের মানুষ জানতো না, একটা চায়ের দোকানে দুইজন মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু গল্প সবসময় সোজা পথে চলে না।
একদিন আরিফ জানাল, সে শহর ছেড়ে যাবে। বাবাকে ভালো চিকিৎসার জন্য অন্য জায়গায় নিতে হবে। দোকান বন্ধ হবে।
নীলার মনে হলো, কেউ যেনো হঠাৎ করে তার পরিচিত আকাশটা ভেঙে ফেলল।
— কবে? নীলা জিজ্ঞেস করেছিল।
— এই মাসের শেষেই।
নীলা সেদিন কিছু বললো না। চা খেল না। শুধু চলে গেলো।
শেষ কয়েকটা দিন চিঠি আসেনি। দোকানটাও যেন চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো।
শেষ দিনে বৃষ্টি হয়নি। আকাশ ছিল অস্বাভাবিক পরিষ্কার।
নীলা দোকানে এসে দেখলো, আরিফ অপেক্ষা করছে। হাতে একটা নীল খাম।
— শেষ চিঠি, আরিফ বলল।
নীলা খুলে পড়ল।
আমি জানি না, ফিরে আসতে পারবো কিনা। কিন্তু যদি কখনো ফিরে আসি, এই শহরে প্রথম তোমাকেই খুঁজবো। যদি না আসি, জেনো—তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে সুন্দর গল্প।
নীলার চোখ ভিজে গেল। সে কিছু বললো না। শুধু নিজের লেখা একটা খাম বাড়িয়ে দিলো।
আরিফ খুলে পড়লো।
ভালোবাসা ধরে রাখার জন্য কাছে থাকা লাগে না। মনে থাকলেই হয়। তুমি যেখানে থাকবে, আমি সেখানেই থাকব—এই চিঠির ভেতরে।
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো,
— আমি ফিরে আসবো।
নীলা হেসেছিল। সেই হাসিতে কান্না ছিল, অপেক্ষা ছিল, বিশ্বাস ছিল।
বছর কেটে গেল।
চায়ের দোকানটা আবার খুললো। নতুন রং, নতুন বেঞ্চ। কিন্তু একদিন সকাল আটটায় নীলা আবার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালো।
— গরম আছে, সাবধানে।
নীলা ফিরে তাকালো।
আরিফ।
বৃষ্টির শহর আবার তার গল্প ফিরে পেল।
আর নীল চিঠিগুলো?
সেগুলো আজও একটা পুরনো ডায়েরির ভেতরে।

0 Comments