পাহাড়ের ওপারে এক অচেনা শহর: রহস্য ও আবিষ্কারের গল্প
গল্প টি শুরু হয় পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এক শহর কে নিয়ে
পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এক শহর—শান্তিপুর। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা মেঘ, ভোরের কুয়াশা, আর সন্ধ্যার লাল আকাশ—সব মিলিয়ে শান্তিপুর যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক প্রেমপত্র।
আরিয়ান এই শহরে এসেছিল পালিয়ে। শহরের কোলাহল, বিশ্বাসঘাতকতা আর ভাঙা স্বপ্ন থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে চেয়েছিল সে। তার জীবনের সবকিছু এক রাতেই ভেঙে পড়েছিল—যাকে ভালোবেসেছিল, সে অন্য কারো হাত ধরে চলে গেছে; আর যে চাকরিকে ভবিষ্যৎ ভেবেছিল, সেটাও ছিনিয়ে নিয়েছে ভাগ্য।
শান্তিপুরে এসে সে একটি পুরনো গেস্টহাউসে উঠল। গেস্টহাউসটির নাম “রাত্রিছায়া”। কাঠের জানালা, পুরনো সিঁড়ি আর চারপাশে লতাগুল্মে ঢাকা—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভুত মায়া ছিলো।
সেদিন বিকেলে প্রথমবার সে তাকে দেখলো। (বাংলা ছোটগল্প রহস্য)
মেয়েটি পাহাড়ের ঢালে বসে স্কেচ করছিল। লম্বা চুল, হালকা সাদা শাল, চোখে একধরনের গভীরতা—যেন পাহাড়ের মতোই নীরব কিন্তু শক্ত। আরিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলো, তারপর নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো। এতদিন পরও কি সে কাউকে দেখে এমনভাবে থমকে যাবে?
আপনি কি কিছু খুঁজছেন?
মেয়েটির কণ্ঠে প্রশ্ন, চোখে কৌতূহল।
আরিয়ান একটু হকচকিয়ে বললো, না… মানে… আমি শুধু হাঁটছিলাম।
মেয়েটি হালকা হাসল। এই পাহাড়ে হাঁটলে অনেকেই হারিয়ে যায়।
হারিয়ে যেতে তো চাই, অন্যমনস্কভাবে বলে ফেললো আরিয়ান।
মেয়েটি আর কিছু বললো না। শুধু আবার স্কেচে মন দিল। আরিয়ান চলে গেলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হলো—এই অচেনা মেয়েটির উপস্থিতি তার ভেতরের কিছু একটা নড়িয়ে দিয়েছে।
পরের কয়েকদিনে তাদের দেখা হতে লাগল। কখনো পাহাড়ি পথে, কখনো পুরনো লাইব্রেরিতে, কখনো গেস্টহাউসের বারান্দায়। মেয়েটির নাম মায়া। সে শান্তিপুরেই বড় হয়েছে। ছবি আঁকে, গল্প লেখে, আর মানুষের চোখে চোখ রেখে তাদের না বলা কথাগুলো বুঝতে ভালোবাসে। (অচেনা শহরের রহস্য গল্প বাংলা)
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল হঠাৎ। পাহাড়ের বৃষ্টির শব্দ যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। আরিয়ান আর মায়া গেস্টহাউসের ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
“আপনি এত চুপচাপ কেনো?” মায়া জিজ্ঞেস করলো।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো। কারণ কিছু মানুষ কথা বললে বেশি কষ্ট পায়।
মায়া তার দিকে তাকাল। কিন্তু চুপ থাকলে কি কষ্ট কমেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আরিয়ানের জানা ছিল না।
সেই রাত থেকেই তাদের বন্ধুত্ব একটু একটু করে বদলাতে লাগলো। অনুভূতি, নীরবতার মধ্যে জন্ম নিল বিশ্বাস। আরিয়ান প্রথমবার কাউকে তার ভাঙা অতীতের কথা বললো। মায়া মন দিয়ে শুনলো, কোনো বিচার ছাড়াই।
একদিন মায়া বললো কাল আমি আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। সাহস থাকলে আসবেন কেমন।
পরদিন ভোরে তারা পাহাড়ের গভীরে হাঁটতে শুরু করল। পথ কঠিন, পাথুরে, কখনো বিপজ্জনক। এক জায়গায় পা পিছলে আরিয়ান পড়ে যেতে যাচ্ছিলো, মায়া তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো।
ছাড়বেন না, মায়া বলল।
সেই মুহূর্তে আরিয়ান বুঝলো—এই হাতটা সে কখনো ছাড়তে চায় না।
অবশেষে তারা পৌঁছাল জলপ্রপাতের কাছে। জলপ্রপাতটা পাহাড়ের গায়ে লুকানো এক বিস্ময়। রোদের আলো পড়ে পানি নীল দেখাচ্ছে।
এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা মায়া বললো। আমি এখানে এলেই নিজের ভয়গুলো রেখে আসি।
আরিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি।
হঠাৎ মায়া বললো, আমি আপনাকে ভালোবাসি।
কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল। পাহাড়, জল, আকাশ—সব যেন থেমে গেলো।
আরিয়ান কিছু বলল না। সে শুধু তাকিয়ে ছিলো। ভালোবাসা তার জন্য সহজ কিছু ছিলো না। সে ভয় পেতো—আবার হারানোর ভয়।
আমি জানি আপনাকে উত্তর দিতে বলছি না, মায়া ধীরে বললো। আমি শুধু সত্যিটা বললাম।
সেই রাতে আরিয়ান ঘুমাতে পারল না। সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—শান্তিপুর ছেড়ে যাবে। ভালোবাসা মানেই কষ্ট, এই বিশ্বাস তার খুব গভীরে ছিলো।
কিন্তু স্টেশনে যাওয়ার পথে হঠাৎ পাহাড় কেঁপে উঠলো। ভূমিধস। চারপাশে আতঙ্ক। আরিয়ানের মাথায় একটাই নাম ঘুরছিলো—মায়া।
সে উল্টো পথে দৌঁড়ালো। জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছে দেখলো—মায়া আটকে পড়েছে। চারপাশে পাথর পড়ছে, পথ বন্ধ।
“মায়া!” আরিয়ান চিৎকার করলো।
মায়া তাকিয়ে বললো, আপনি কেনো ফিরে এলেন?
“কারণ আমি আপনাকে হারাতে পারি না!”
আরিয়ান ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গেলো। পাথরের আঘাতে হাত কেটে গেল, পা পিছলাল, তবুও সে থামেনি। শেষ পর্যন্ত সে মায়ার কাছে পৌঁছালো, তার হাত ধরলো।
এবার ছাড়বেন না, মায়া কাঁপা কণ্ঠে বললো।
কখনো না,
তারা একসঙ্গে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাল।
সেই দিন আরিয়ান বুঝলো—ভালোবাসা কষ্ট নয়।
কয়েক মাস পর শান্তিপুরের পাহাড়ে একটি ছোট প্রদর্শনী হলো। মায়ার আঁকা ছবিতে ছিল পাহাড়, জলপ্রপাত, আর এক যুবকের চোখে নতুন জীবন। (বাংলা গল্প অন্বেষণ পাহাড়ের ওপারে)
আরিয়ান এখন শান্তিপুরেই থাকে। পালিয়ে নয়—ফিরে এসেছে নিজের কাছে।

0 Comments