অসাধারণ এক খালি পায়ে মানুষ – অনুপ্রেরণামূলক বাংলা গল্প
“পাঠক বন্ধু, এই গল্পে আমরা শিখব সাহস ও ধৈর্যের মানে”
লোকটা সবসময় খালি পায়ে হাঁটে। শহরের লোকজন প্রথমে অবাক হয়েছিলো, এখন আর হয় না। অবাক হওয়ার শক্তি শহরের মানুষের বেশি দিন থাকে না। অভ্যাস হয়ে যায়।
লোকটার নাম অদ্বৈত। তবে সে নিজে কখনো নাম বলে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে হালকা হাসে। হাসিটা এমন, যেন প্রশ্নটাই অপ্রয়োজনীয়।
অদ্বৈতের পা নীলচে। ঠিক নীল না—বৃষ্টি শেষে আকাশ যেমন হয়, ঠিক তেমন রঙ। কেনো নীল, কেউ জানে না। কেউ জানতে চায়ও না। জিজ্ঞেস করলে সে বলে,
“পা তো মাটিতে থাকে, মাটি আকাশের স্বপ্ন দেখে।”
এই কথা শুনে মানুষ চুপ করে যায়।
অদ্বৈত কোথায় থাকে, সেটাও পরিষ্কার না। কেউ বলে সে পুরোনো শ্মশানের পাশে থাকে। কেউ বলে রেললাইনের ধারে ভাঙা ঘরে। আবার কেউ বলে—সে কোথাও থাকে না, সে শুধু হাঁটে।
আজ সকালেও সে হাঁটছিল।
লেকের পাশে একা একা হাঁটছিল সে। হাতে কিছু নেই। পকেট নেই। জামাটা ঢিলেঢালা, রঙহীন। চোখে গভীর একটা শান্তি, যেন বহু প্রশ্নের উত্তর সে আগেই পেয়ে গেছে। (অনুপ্রেরণামূলক বাংলা গল্প – Inspirational Bengali Story)
একটা ছোট মেয়ে তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো।
মেয়েটার নাম বেলা। বয়স আট কি নয়—ঠিক বোঝা যায় না। চোখ দুটো খুব একটা বড়ো নয়। বড়দের মতো করে তাকায়।
—কাকু, আপনার পা নীল কেন?
অদ্বৈত থামলো।
—তুমি কি কখনো নদীকে কাঁদতে দেখেছ?
বেলা মাথা নাড়লো।
—নদী কাঁদে না।
—কাঁদে। কিন্তু শব্দ করে না।
এই কথা বলে সে আবার হাঁটা শুরু করলো।
বেলা সেদিন থেকে প্রতিদিন তাকে খুঁজে বেড়ায়।
শহরে একটা কথা ছড়িয়ে পড়ল—নীল পায়ের মানুষটা নাকি মানুষের মনের কথা বলতে পারে।
এই গুজব কে ছড়ালো, কেউ জানে না।
একদিন এক ব্যস্ত অফিস কর্মী, নাম মাহির, অদ্বৈতের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।
(সংগ্রামী মানুষ গল্প – Struggle Bengali Story)
—আপনি কি সত্যিই মনের কথা বলতে পারেন?
অদ্বৈত তাকালো।
—তুমি জানো না, তাই জানতে চাও।
মাহির চমকে উঠলো।
—আমি জানি না বলেই তো জানতে চাই।…
তুমি জানো। কিন্তু মেনে নিতে ভয় পাও।
মাহির সেদিন অফিসে আর যায়নি। সে লেকের ধারে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলো।
অদ্বৈত কাউকে থামায় না। কাউকে টানেও না। মানুষ নিজেরাই এসে দাঁড়ায় তার সামনে।
এক রাতে বৃষ্টি নামলো। শহর ভিজে গেলো। রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হয়ে এলো।
অদ্বৈত হাঁটছিলো রেললাইনের পাশে।
হঠাৎ একটা কণ্ঠ শুনলো—
—আপনি কি কখনো ভয় পান না?
কণ্ঠটা মেয়েলি।
মেয়েটার নাম ইলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
—ভয় হলো অন্ধকার ঘরের দরজা। ঢুকলে আলো দেখা যায়।
—আপনি কি আলো দেখেছেন?
—দেখেছি। কিন্তু সেটা আমার না।
ইলা হেসে ফেললো।
—আপনি পাগল।
—হ্যাঁ। তবে হিসাব রাখা পাগল।
সেই রাতে ইলা প্রথমবার শান্তিতে ঘুমিয়েছিল।
শহরের এক বৃদ্ধ জ্যোতিষী বললো,
এই লোকটা স্বাভাবিক না। ওর আশপাশে বেশি যেও না।
(হৃদয়ছোঁয়া বাংলা গল্প – Heart-touching Bengali Story)
লোকজন হাসলো।
কিন্তু জ্যোতিষী নিজে এক রাতে অদ্বৈতের খোঁজে বের হয়েছিলো।
অদ্বৈত কখনো কাউকে আশ্বাস দেয় না। বলে না—সব ঠিক হয়ে যাবে।
সে শুধু বলে—
যা আছে, সেটাই যথেষ্ট।”
এই কথাটা শুনে মানুষ কষ্ট পায়। আবার শান্তিও পায়।
একদিন বেলা জিজ্ঞেস করলো,
—কাকু, আপনি কি মারা যাবেন?
অদ্বৈত বলল,
—সবাই যায়। কেউ কেউ আগেই পৌঁছে যায়।
—আপনি?
—আমি পথেই আছি।
বেলা কিছু বুঝলো না। কিন্তু তার ভয় লাগলো না।
শহরের মানুষ একদিন লক্ষ্য করল—নীল পায়ের মানুষটাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
লেকের ধারে নেই। রেললাইনে নেই। শ্মশানের পাশেও নেই।
অনেকে বলল—সে চলে গেছে।
কেউ বললো—সে ছিলো না।
বেলা একা একা লেকের ধারে বসে রইলো।
হঠাৎ সে দেখল—জলের মধ্যে তার নিজের পা একটু নীলছে লাগছে।
(নারী ও পুরুষ সংগ্রাম গল্প – Life Struggle Bengali Story)
অদ্বৈত কোনো মানুষ ছিলো না।
সে ছিলো প্রশ্নের মাঝখানের নীরবতা।
যেখানে উত্তর দরকার হয় না।

0 Comments