নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া নদীর কথা – এক হৃদয়ছোঁয়া বাংলা গল্প
নদী যেমন নিঃশব্দে বয়ে চলে, তেমনি মানুষের জীবনের অনেক গল্পও শব্দহীনভাবে হৃদয়ের গভীরে প্রবাহিত হয়। নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া নদীর কথা এমনই এক আবেগময় বাংলা গল্প, যেখানে স্মৃতি, অপেক্ষা আর জীবনের গভীর উপলব্ধি একসাথে মিলেমিশে গেছে। এই গল্পে নদী শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, বরং জীবনের প্রতীক—যা ধীরে ধীরে বয়ে চলে সময়ের স্রোতে। (নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া নদীর কথা গল্প)
গল্পটি পাঠককে নিয়ে যাবে নীরবতার ভেতরের শব্দে, অনুভূতির গভীরতায় এবং এক শান্ত অথচ শক্তিশালী জীবনদর্শনে। ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য এই গল্প বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়স্পর্শী।
“চলুন, নীরবতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক গল্পের পথে হাঁটি”
গ্রামটার নাম কেউ ঠিক করে জানে না। মানচিত্রে নেই, পোস্ট অফিসে নেই, তবু নদীর বাঁকে বাঁকে সে গ্রাম বহু বছর ধরে টিকে আছে। লোকজন একে বলে “ওপারের গ্রাম”—কারণ নদীর এপার থেকে ওটা সবসময়ই একটু দূরের, একটু ধোঁয়াটে।
এই গ্রামেই জন্মেছিল নীরব। নামের মতো সে কখনো ছিলো না, কিন্তু মানুষ তাকে সেই নামেই ডাকত। নীরবের চোখে ছিলো নদীর রঙ—কখনো শান্ত, কখনো অস্থির। ছোটবেলা থেকেই সে নদীর ধারে বসে থাকতো। সবাই ভাবত, সে মাছ দেখে, স্রোত দেখে। কিন্তু নীরব আসলে শুনত—নদীর কথা।
নদী কথা বলে, এটা গ্রামে সবাই জানে। তবে সবাই শোনে না।
নীরবের মা বলতো, “নদীর দিকে বেশি তাকাইস না। নদী মানুষ ডাকে।”
নীরব হাসতো। তার মনে হতো, যদি নদী ডাকে, সে যাবেই।
নদীর কোনো নাম ছিল না। মানুষ নাম দিতে গিয়েও দেয়নি। কেউ বলতো, নামহীন নদী বেশি আপন হয়। নীরবও তাকে নাম দেয়নি। সে শুধু বলত—“নদী।” (হৃদয়ছোঁয়া বাংলা গল্প)
গ্রামে একসময় একটা স্কুল ছিলো। এখন শুধু টিনের চাল আর ভাঙা বেঞ্চ। নীরব সেখানেই পড়তে শিখেছিল। মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার দিন বলেছিলেন, “নীরব, তুই লিখবি। তোর চোখে গল্প আছে।”
লিখবে কীভাবে, সেটা নীরব জানত না। কাগজ-কলম ছিলো না, সময়ও ছিলো না। বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে যেতে হতো, মায়ের সঙ্গে ক্ষেতের কাজ, মাঝে মাঝে হাটে বোঝা টানার কাজ।
তবু গল্প তার ভেতরে জমে থাকতো।
এক বর্ষার বিকেলে গ্রামে নতুন একজন এল। তার নাম পদ্ম। শহর থেকে এসেছে, বলে। তার চুলে শহরের গন্ধ ছিল—সাবান আর অচেনা হাওয়ার গন্ধ। পদ্ম প্রথম দিনই নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সবাই দূর থেকে দেখছিলো। নীরব কাছে গিয়েছিলো।
“নদীর নাম কী?” পদ্ম জিজ্ঞেস করেছিলো।
নীরব মাথা নেড়ে ছিলো। “নাম নাই।”
পদ্ম হেসেছিলো। “নাম ছাড়া জিনিস থাকতে পারে?”
নীরব কিছু বলেনি। নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলো।
তারপর থেকে পদ্ম প্রতিদিন নদীর ধারে আসত। কখনো বই নিয়ে, কখনো শুধু বসে থাকতে। নীরবও থাকত। তারা খুব বেশি কথা বলতো না। কিন্তু দুজনের নীরবতা আলাদা ছিলো না।
একদিন পদ্ম বললো, “আমি গল্প লিখি।”
নীরব অবাক হয়েছিলো। “গল্প?”
“হ্যাঁ। মানুষের গল্প, নদীর গল্প।”
নীরব ধীরে বলেছিলো, “নদী নিজেই গল্প।”
পদ্ম তার দিকে তাকিয়ে ছিলো অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিলো, “তুমি লিখো না কেনো?”
নীরব হেসে ফেলেছিলো। “আমার কাগজ নাই।” (আবেগময় বাংলা গল্প)
পদ্ম তার ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করে দিয়েছিল। সাদা মলাট, ভেতরে সাদা পাতা। “এটা নাও।”
সেদিন রাতে নীরব খাতাটা খুলেছিলো। কলম ছিলো না। সে কয়লার টুকরো দিয়ে লিখেছিলো। অক্ষরগুলো বেঁকে যাচ্ছিলো, তবু সে লিখেছিলো নদীর কথা—কীভাবে নদী মানুষ ডাকে, কীভাবে সে রাতে শব্দ করে।
দিনের পর দিন সে লিখতে লাগলো। পদ্ম পড়তো, হাসত, কখনো চুপ করে থাকতো।
গ্রামে গুজব শুরু হলো। “শহরের মেয়ে আর নীরব…”
মা চিন্তিত হলো। বাবা চুপ।
একদিন হঠাৎ খবর এলো—নদীর ওপর বাঁধ হবে। শহরের লোক আসলো, দাগ টানলো। বললো, “গ্রামটা সরাতে হবে।”
নদী সেদিন খুব শব্দ করছিলো।
পদ্ম কাঁদছিলো। “নদীটা থাকবে না?”
নীরব বলেছিলো, “নদী থাকবে। বদলে যাবে, কিন্তু থাকবে।”
কিন্তু সে জানতো, সব বদল টিকে না।
বাঁধের কাজ শুরু হলো। মাটি, মেশিন, চিৎকার। নদী সরু হয়ে এলো। গ্রাম ফাটল ধরল। মানুষ একে একে চলে গেলো।
পদ্মেরও যাওয়ার দিন এলো। শহরে ফিরতে হবে। যাওয়ার আগে সে নীরবকে খাতাটা ফেরত দিলো। বলল, “তুমি লিখে যাও। তোমার গল্প কেউ থামাতে পারবে না।” (নদী ও মানুষের জীবনের গল্প বাংলা)
নীরব কিছু বলতে পারেনি।
পদ্ম চলে যাওয়ার পর নদী আরও নীরব হলো। এক রাতে বাঁধ ভেঙে পানি উঠল। গ্রাম ডুবলো। নীরব মাকে নিয়ে উঁচু জায়গায় উঠলো। বাবা আর ফেরেনি।
কয়েকদিন পর সব থেমে গেলো। গ্রাম ছিলো, কিন্তু আগের মতো না। নদী ছিলো, কিন্তু অন্যরকম।
নীরব আবার নদীর ধারে বসে। খাতাটা খুলে লিখে—
“নদীর নাম নেই। তবু সে সব নাম জানে।”
অনেক বছর পরে, শহরের এক বইমেলায় একটি বই বেরোলো। লেখকের নাম—নীরব। বইয়ের প্রথম গল্পের নাম ছিল “নদীর নাম ছিল না”। (নিঃশব্দ অনুভূতির বাংলা গল্প পড়ুন)
পদ্ম সেই বই পড়ে কেঁদেছিলো। বইয়ের পাতায় সে নদীর শব্দ শুনতে পেয়েছিল।

0 Comments